Nepal Gen Z Movement
ক্লাউড টিভি সম্পাদকীয় : বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কার পর এবার নেপাল। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে তরুণ প্রজন্মের উত্থান এখন এক বাস্তবতা। নেপালে ২০২৫ সালের গণআন্দোলন এবং তার পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনকে অনেকেই ‘জেন-জি বিপ্লব’ বলে অভিহিত করছেন। দুর্নীতি, বেকারত্ব এবং পুরনো রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকেই এই আন্দোলনের (Nepal Gen Z Movement) জন্ম। কিন্তু প্রশ্ন হল— এই পরিবর্তন কি শুধুই নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিবর্তন, নাকি এর পিছনে বড় শক্তিগুলির কৌশলগত আগ্রহও কাজ করছে?
বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে নেপাল আর শুধু হিমালয়ের একটি ছোট রাষ্ট্র নয়। ভারত ও চীনের মাঝখানে অবস্থিত এই দেশটি এখন ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। ফলে নেপালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের দিকে শুধু কাঠমান্ডু নয়, ওয়াশিংটন ও বেজিংও গভীর নজর রাখছে।
নেপালের তরুণ সমাজের ক্ষোভ বাস্তব। বহু বছর ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্বল অর্থনীতি এবং কর্মসংস্থানের সংকট দেশটিকে বিপর্যস্ত করেছে। পুরনো দলগুলির প্রতি আস্থা হারিয়ে নতুন নেতৃত্বের খোঁজ শুরু করেছে যুবসমাজ। সেই আবহেই উঠে এসেছেন নতুন প্রজন্মের নেতারা, যাঁদের অনেকেই নিজেদের দুর্নীতিবিরোধী এবং প্রতিষ্ঠানের বাইরে থাকা বিকল্প শক্তি হিসেবে তুলে ধরছেন।
কিন্তু ইতিহাস বলছে, যুব আন্দোলন (Nepal Gen Z Movement) প্রায়শই আন্তর্জাতিক শক্তির আগ্রহের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, আন্তর্জাতিক তহবিল, এনজিও নেটওয়ার্ক এবং সফট পাওয়ার কূটনীতি— সবই আজ রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার। যুক্তরাষ্ট্র গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা ও মানবাধিকারের ভাষা ব্যবহার করে প্রভাব বাড়াতে চায়, অন্যদিকে চীন অবকাঠামো, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার মাধ্যমে নিজের অবস্থান মজবুত করতে চায়। নেপালের তরুণ প্রজন্ম সেই প্রতিযোগিতার মাঝখানে পড়ে যাচ্ছে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
তবে এই আলোচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা জরুরি। নেপালের যুবকদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে বিদেশি ষড়যন্ত্র বলে উড়িয়ে দেওয়া যেমন ভুল, তেমনই আন্তর্জাতিক শক্তির প্রভাবকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করাও বাস্তবসম্মত নয়। যে কোনও গণআন্দোলনের মূল শক্তি থাকে মানুষের অসন্তোষ। বাইরের শক্তি সেই অসন্তোষকে কাজে লাগাতে পারে, কিন্তু সৃষ্টি করতে পারে না।
নেপালের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন স্বাধীন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ। যদি নতুন নেতৃত্ব কেবল বিদেশি শক্তিগুলির প্রভাবের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার খেলায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তাহলে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হবে না। আবার যদি তারা সত্যিই প্রশাসনিক সংস্কার, কর্মসংস্থান এবং দুর্নীতি দমনে সফল হয়, তাহলে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি হতে পারে।
নেপালের জেন-জি আন্দোলন তাই শুধু একটি দেশের গল্প নয়। এটি পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি সতর্কবার্তা। তরুণ প্রজন্ম পরিবর্তন চায়। কিন্তু সেই পরিবর্তন যেন কোনও বিদেশি শক্তির ভূ-রাজনৈতিক দাবার ঘুঁটিতে পরিণত না হয়, সেটাই গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।