Nepal Trishuli Valley floods
যুদ্ধের ময়দানে ধ্বংস দেখেছেন বহুবার। কিন্তু নেপালের ত্রিশূলী উপত্যকার আকাশপথে যা দেখলেন সাংবাদিকরা, অনেক দিক থেকেই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের এই ছবি আধুনিক যুদ্ধের থেকেও বেশি ভয়াবহ। কয়েক দিন আগেও যেখানে ছিল বাড়িঘর, দোকান, রাস্তা, সেতু ও গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো, হেলিকপ্টার থেকে সেখানে এখন দেখা যাচ্ছে শুধুই বিস্তীর্ণ কাদামাটির চাদর।
নেপালের বিপর্যস্ত অঞ্চলে বেশ কয়েক দিন মাটিতে রিপোর্টিং করার পর সাংবাদিকদের দল হেলিকপ্টারে করে ত্রিশূলী নদীর উপত্যকা ধরে উত্তরের দিকে রওনা দেয়। কাঠমান্ডু থেকে উড়ে দলটি বিদুর, বেত্রাবতী, ধরাপানি, ঘুমতি বাজার, রামছে, ধুনছে ও তিমুরে হয়ে রাসুওয়াগঢ়ীর দিকে এগোয়।
আকাশপথে দৃশ্যটি ছিল আরও ভয়াবহ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বহু জায়গায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়ির অবশিষ্টাংশও আর দেখা যাচ্ছিল না। যেখানে কয়েক দিন আগেও জনবসতি ছিল, সেখানে এখন শুধু বিশাল কাদামাটির সমতল। রাস্তা, সেতু, বাড়ি, দোকান এবং অন্যান্য পরিকাঠামো যেন নদীর প্রবল স্রোতে সম্পূর্ণ মুছে গিয়েছে।
হেলিকপ্টারটি ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ এলাকায় অবতরণ করে। এই প্রকল্প-সহ ত্রিশূলী নদী ব্যবস্থার একাধিক run-of-the-river জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সুড়ঙ্গের ভিতরে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারে উদ্ধারকারীরা মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন। কিন্তু বিপুল পরিমাণ কাদা ও পলি সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ আটকে দিয়েছে। ঘটনাস্থলে একটি excavator দিয়ে মাটি সরানোর কাজ চলছিল। তবে তখনও আটকে থাকা ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছনোর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
ত্রিশূলী নদীর জল ভয়াবহ গতিতে ফুলে ওঠার পর বহু এলাকায় তিনতলা বাড়ির সমান উচ্চতায় জল পৌঁছেছিল বলে সাংবাদিকদের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। প্রবল স্রোতের সঙ্গে বয়ে আসা কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ গোটা নদী উপত্যকার ভূপ্রকৃতিই বদলে দিয়েছে।
বহু জায়গায় এমন পরিস্থিতি হয়েছে যে, আকাশ থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই যে সেখানে মাত্র কয়েক দিন আগেও মানুষ বসবাস করতেন।
ত্রিশূলী নদীর করিডরে এক ডজনেরও বেশি run-of-the-river জলবিদ্যুৎ প্রকল্প রয়েছে। বন্যায় কার্যত সবকটিই ধ্বংস বা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নেপাল সাধারণত বিদ্যুৎ উদ্বৃত্ত দেশ হিসেবে পরিচিত হলেও এই বিপর্যয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলির ক্ষতি দেশের power grid-এর উপর বড় চাপ তৈরি করেছে।
হেলিকপ্টারটি চিন সীমান্তের কাছে রাসুওয়াগঢ়ী পর্যন্ত পৌঁছয়। একসময় ব্যস্ত সীমান্ত বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই এলাকাতেও ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের ছবি দেখা যায়। কোথাও কার্যত কোনও কাঠামো অবশিষ্ট নেই।
একই সঙ্গে উপত্যকার বহু রাস্তা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে দুর্গম এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
আধুনিক যুদ্ধে সাধারণত collateral damage কমানোর চেষ্টা থাকে। কিন্তু প্রকৃতির ভয়াবহ স্রোতের সামনে সেই নিয়ন্ত্রণ থাকে না। নদীর স্রোত যখন বিশাল পাথর, কাদা ও পলি নিয়ে ছুটে আসে, তখন তার পথে থাকা প্রায় সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
ত্রিশূলী উপত্যকায় সেই ধ্বংসের ছবিই ধরা পড়েছে। বহু মানুষ এখনও নিখোঁজ। তাঁদের পরিবারের কাছে প্রিয়জনের পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত খবর পাওয়াও কঠিন হয়ে উঠেছে। বিপুল পরিমাণ কাদার নিচে চাপা পড়া দেহ উদ্ধার করতে সপ্তাহ বা মাস লেগে যেতে পারে—কখনও তা সম্ভব নাও হতে পারে।
বিধ্বস্ত ত্রিশূলী উপত্যকায় এখনও উদ্ধারকারীদের লড়াই চলছে। বিশেষ করে সুড়ঙ্গে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করতে হচ্ছে।
আকাশপথে দেখা ধ্বংসের মাত্রা স্পষ্ট করে দিচ্ছে, এই বিপর্যয়ের ক্ষত সারতে দীর্ঘ সময় লাগবে। তবে নিখোঁজদের সন্ধান এবং আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারের আশা এখনও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।