Nepal Agniveer Demand
নেপালে ফের জোরালো হয়েছে ভারতীয় সেনায় গোর্খা নিয়োগের দাবি। ভারতের অগ্নিপথ প্রকল্পের আওতায় নেপালি তরুণদের নিয়োগের দাবি উঠেছে। এই দাবিতে পোখরায় পথে নেমেছেন প্রাক্তন গোর্খা সেনা এবং তরুণরা। তাঁদের বক্তব্য, গালফের দেশে চাকরি করার চেয়ে ভারতীয় সেনায় অগ্নিবীর হওয়া অনেক ভালো।
বুধবার পোখরায় এই বিক্ষোভ হয়। আয়োজকদের মধ্যে ছিল Indian Ex-Servicemen Gorkha Brigade Nepal। প্রাক্তন সেনা, তাঁদের পরিবারের সদস্য এবং সেনায় যোগ দেওয়ার প্রশিক্ষণ নেওয়া তরুণরা মিছিলে অংশ নেন। পরে কাস্কি জেলার প্রধান জেলা আধিকারিকের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়।
এই আন্দোলনের সময়টিও তাৎপর্যপূর্ণ। ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল ধীরাজ শেঠের নেপাল সফরের ঠিক আগে এই বিক্ষোভ হয়েছে। আগামী ১৬ অগস্ট থেকে তাঁর পাঁচ দিনের নেপাল সফর শুরু হওয়ার কথা।
পোখরার রাস্তায় নেপালি তরুণদের হাতে দেখা যায় একাধিক প্ল্যাকার্ড। তাঁদের মূল দাবি, ভারতীয় সেনায় নেপালি যুবকদের নিয়োগ ফের শুরু করতে হবে। বিশেষ করে অগ্নিপথ প্রকল্পের আওতায় এই নিয়োগ চালুর দাবি জানানো হয়েছে।
বিক্ষোভকারীদের বক্তব্য, নেপালে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। তাই বহু তরুণ বিদেশে কাজের সন্ধান করেন। বিশেষ করে গালফ দেশগুলিতে কাজ করতে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে।
কিন্তু বিক্ষোভকারীদের মতে, ভারতীয় সেনায় যোগ দেওয়া তাঁদের কাছে বেশি সম্মানের।
সেনাবাহিনীতে কাজের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে গোর্খা পরিচয়ের দীর্ঘ ঐতিহ্য। সেই ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্যও তাঁরা নিয়োগ ফেরানোর দাবি তুলেছেন।
তাঁদের দাবি শুধু চাকরির জন্য নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একটি ঐতিহাসিক সামরিক সম্পর্ক। ভারতীয় সেনায় গোর্খা রেজিমেন্টের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ভারত ও নেপালের সম্পর্কেও এই নিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
তাই নিয়োগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নেপালের বহু পরিবার সমস্যায় পড়েছে বলে আন্দোলনকারীদের দাবি।
ভারতীয় সেনায় নেপালি গোর্খাদের নিয়োগ বহু দশকের পুরনো। কিন্তু ২০১৯ সাল থেকে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ রয়েছে। প্রথমে কোভিড-১৯ মহামারির কারণে নিয়োগ বন্ধ হয়েছিল। এরপর ২০২২ সালে ভারতের অগ্নিপথ প্রকল্প চালু হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়।
অগ্নিপথ প্রকল্পে সেনায় নিয়োগের মেয়াদ চার বছর। এরপর সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ অগ্নিবীরকে স্থায়ীভাবে রাখা হতে পারে। বাকি ৭৫ শতাংশকে এককালীন অর্থ দিয়ে অবসর নিতে হয়। তাঁদের পেনশন বা দীর্ঘমেয়াদি সামরিক চাকরির সুবিধা থাকে না।
নেপাল সরকার এই ব্যবস্থার সঙ্গে আপত্তি জানিয়েছিল। তাদের বক্তব্য ছিল, অগ্নিপথ প্রকল্প ১৯৪৭ সালের ভারত-নেপাল-ব্রিটেন ত্রিপাক্ষিক চুক্তির কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সেই কারণেই নেপালি নাগরিকদের অগ্নিপথের মাধ্যমে ভারতীয় সেনায় নিয়োগের অনুমতি দেওয়া হয়নি।
এই অবস্থায় কয়েক বছর ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন সেনায় যোগ দিতে ইচ্ছুক নেপালি তরুণরা। অনেকেই আগে থেকেই সেনা নিয়োগের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন।
শারীরিক প্রশিক্ষণও নিয়েছিলেন। কিন্তু নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় তাঁদের সামনে ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এবার তাই ফের সরব হয়েছেন তাঁরা।
পোখরার বিক্ষোভকারীরা শুধু অগ্নিপথে নিয়োগ ফেরানোর দাবি তোলেননি। প্রাক্তন সেনাদের সংগঠন নিয়ে আরও একটি দাবি রয়েছে তাঁদের। তাঁদের বক্তব্য, প্রাক্তন সেনাদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনগুলির নিবন্ধন বন্ধ করা উচিত নয়। এই সংগঠনগুলি প্রাক্তন সেনাদের অধিকার, মর্যাদা এবং স্বার্থ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বলে তাঁদের দাবি।
বিক্ষোভকারীরা পোখরা স্টেডিয়াম থেকে মিছিল শুরু করেন। মিছিল গিয়ে পৌঁছয় জেলা প্রশাসনের দফতরে। সেখানেই কাস্কি জেলার প্রধান জেলা আধিকারিকের হাতে স্মারকলিপি তুলে দেওয়া হয়। এদিকে ভারতীয় সেনাপ্রধানের নেপাল সফর সামনে আসায় এই দাবি নতুন রাজনৈতিক গুরুত্ব পেয়েছে। ভারতীয় সেনার সঙ্গে গোর্খাদের সম্পর্ক বহু পুরনো। তাই নিয়োগ ফেরানো নিয়ে নেপালে জনমতও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
তবে এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেপাল সরকারের হাতেই রয়েছে বলে প্রাক্তন ভারতীয় প্রতিরক্ষা আধিকারিকদের বক্তব্য উঠে এসেছে। অর্থাৎ ভারত নিয়োগ করতে প্রস্তুত হলেও নেপালের সম্মতি প্রয়োজন। সেই কারণেই পোখরার আন্দোলনকারীরা সরাসরি কাঠমান্ডোর সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন।
নেপালের বর্তমান সরকারকে তাঁরা দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া চালুর দাবি জানিয়েছেন।
তাঁদের বক্তব্য, এই সুযোগ বন্ধ থাকলে দেশের বহু তরুণ বিদেশে অন্য ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যেতে বাধ্য হবেন। অন্যদিকে অগ্নিপথ প্রকল্প নিয়েও নেপালে প্রশ্ন রয়েছে।
চার বছরের চাকরি এবং সীমিত সংখ্যক স্থায়ী নিয়োগের বিষয়টি নিয়ে নেপাল সরকার আগে আপত্তি জানিয়েছিল। তাই শুধু নিয়োগের ইচ্ছা থাকলেই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।
প্রয়োজন ভারত ও নেপালের মধ্যে একটি নতুন সমঝোতা। বিশেষ করে ১৯৪৭ সালের ত্রিপাক্ষিক চুক্তির সঙ্গে অগ্নিপথের কাঠামো কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।
তবে পোখরার আন্দোলন একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে। নেপালি তরুণদের একটি অংশ এখনও ভারতীয় সেনায় যোগ দেওয়াকে অত্যন্ত আকর্ষণীয় পেশা হিসেবে দেখছেন।
তাঁদের কাছে এটি শুধু একটি চাকরি নয়। এটি গোর্খা সামরিক ঐতিহ্যের অংশ। এটি সামাজিক মর্যাদার সঙ্গেও যুক্ত।
এখন দেখার বিষয়, নেপাল সরকার এই দাবির বিষয়ে কী অবস্থান নেয়।
ভারতীয় সেনাপ্রধানের আসন্ন সফরে বিষয়টি আলোচনায় আসে কি না, সেদিকেও নজর থাকবে। অগ্নিপথ নিয়ে ভারত-নেপালের পুরনো জট কাটাতে কোনও নতুন সূত্র বের হয় কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর সঙ্গে শুধু সেনা নিয়োগ নয়, দুই দেশের ঐতিহাসিক ও কৌশলগত সম্পর্কও জড়িয়ে রয়েছে।