Houthi Attack Saudi Arabia
ঢাকঢোল পিটিয়ে নতুন প্রতিরক্ষা জোটের ঘোষণা। তার পরেই সৌদি আরবে হুথি হামলা। ফলে সৌদি আরব, পাকিস্তান এবং তুরস্কের সদ্য স্বাক্ষরিত প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
৭ আগস্ট মক্কায় সৌদি আরব, পাকিস্তান এবং তুরস্ক যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করে। চুক্তির মূল বক্তব্য, তিন দেশের যে কোনও একটির উপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের উপর হামলা হিসেবেই দেখা হবে। অর্থাৎ আক্রান্ত দেশের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাকি দুই দেশ। এই কাঠামোকে অনেকেই অনানুষ্ঠানিক ভাবে ‘মুসলিম ন্যাটো’ বলে উল্লেখ করছেন।
কিন্তু চুক্তির ঘোষণার দু’দিনের মধ্যেই সৌদি আরবের জিজানে হামলার দাবি করেছে ইয়েমেনের হুথিরা। রবিবার হুথিদের তরফে দাবি করা হয়, সৌদি আরামকোর জিজান তেল শোধনাগারকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। হামলার পর শোধনাগারে আগুন লাগে বলে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
সৌদি আরবের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জিজান অঞ্চলে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থা সৌদি আরামকোর গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো। রবিবার সেখানে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে বলে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
হামলার পর একটি স্থাপনায় আগুন ধরে যায়। সৌদি জ্বালানি মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে, দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। এখনও পর্যন্ত এই ঘটনায় কোনও হতাহতের খবর নেই।
হামলার দায় স্বীকার করেছে ইয়েমেনের হুথিরা। সংগঠনটির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেছেন, জিজানের তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে।
হুথিদের বক্তব্য, ইয়েমেনের আকাশসীমায় সৌদি ড্রোনের কথিত অনুপ্রবেশের জবাবেই এই হামলা চালানো হয়েছে। অর্থাৎ হামলাটিকে প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরেছে হুথিরা।
তবে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে হুথিদের এই বক্তব্যের সবটা স্বতন্ত্র ভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে হামলার প্রেক্ষাপট নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে।
হামলার সময়টিই সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে। ৭ আগস্ট সৌদি আরব, পাকিস্তান এবং তুরস্ক যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করে। তার পরেই সৌদি ভূখণ্ডে হুথি হামলার ঘটনা সামনে এল।
এই চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। কোনও একটি সদস্য রাষ্ট্রের উপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের উপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে। তুরস্কের প্রতিরক্ষামন্ত্রীও এই ব্যবস্থাকে ন্যাটোর আর্টিকেল ৫-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন।
তবে এর বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
কারণ জিজানে হামলার পর পাকিস্তান এবং তুরস্ক কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়, সেটাই এই নতুন ব্যবস্থার প্রথম বড় পরীক্ষা হতে পারে। শুধু একটি চুক্তিতে সই করলেই কোনও প্রতিরক্ষা জোট ন্যাটোর মতো কার্যকর সামরিক কাঠামোয় পরিণত হয় না।
ন্যাটো তৈরি হওয়ার পিছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের সামরিক সমন্বয়, যৌথ কমান্ড কাঠামো এবং সদস্য দেশগুলির মধ্যে গভীর প্রতিরক্ষা সহযোগিতা। তাই সৌদি-পাকিস্তান-তুরস্ক চুক্তির বাস্তব সামরিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক।
এই কারণেই অনেকে জোটটিকে ‘মুসলিম ন্যাটো’ বললেও সেটিকে ন্যাটোর সমতুল্য সামরিক জোট হিসেবে দেখার আগে সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে।
সৌদি আরব এবং হুথিদের মধ্যে উত্তেজনা অবশ্য নতুন নয়। ইয়েমেন যুদ্ধের সময় থেকেই দু’পক্ষের মধ্যে সংঘাত রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়েও সৌদি ভূখণ্ডকে লক্ষ্য করে হুথিদের হামলার অভিযোগ উঠেছে। গত জুলাইয়েও সৌদির দক্ষিণাঞ্চলে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার নিন্দা করেছিল তুরস্ক।
জিজান হামলা সেই উত্তেজনাকেই আরও সামনে নিয়ে এল।
বিশেষ করে সৌদি আরব যখন নতুন প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব ঘোষণা করেছে, তখনই তার গুরুত্বপূর্ণ একটি তেল স্থাপনায় হামলার ঘটনা সামনে আসায় বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলের নজর কেড়েছে।
তবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সৌদি-পাকিস্তান-তুরস্ক জোটকে এখনই ‘ব্যর্থ’ বলে চিহ্নিত করা কঠিন। কারণ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় কী পরিস্থিতিতে সামরিক প্রতিক্রিয়া জানানো হবে, তার বাস্তব প্রয়োগ নির্ভর করবে চুক্তির নির্দিষ্ট শর্ত এবং তিন দেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের উপর।
অন্যদিকে, হুথিরা যে সৌদি ভূখণ্ডে আঘাত হানতে সক্ষম, এই ঘটনা তারই বার্তা দিয়েছে। ফলে নতুন জোটের ঘোষণার পর প্রথম বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ সামনে এসে গেল বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ।
এখন নজর থাকবে সৌদি আরবের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। একই সঙ্গে পাকিস্তান এবং তুরস্ক এই হামলার পর কী ধরনের কূটনৈতিক বা সামরিক অবস্থান নেয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ চুক্তির কাগজে থাকা ‘এক দেশের উপর হামলা মানে সকলের উপর হামলা’ নীতি বাস্তবে কতটা কার্যকর, জিজানের ঘটনাই সেই প্রশ্নের প্রথম বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।