• ১৮ ভাদ্র ১৪৩৩
  • বৃহস্পতিবার
  • ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Pakistan Crisis

বালোচিস্তান থেকে কেপি, পিওকে—একসঙ্গে ৪ ফ্রন্টে চাপে পাকিস্তান, বদলাবে কি মানচিত্র?

বালোচিস্তান, খাইবার পাখতুনখোয়া ও পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরে একসঙ্গে অস্থিরতা। তার সঙ্গে অর্থনৈতিক চাপ ও গভর্ন্যান্স সংকট। ২০২৬ সালে একাধিক ফ্রন্টে চাপে ইসলামাবাদ। তবে পাকিস্তানের মানচিত্র বদলে যাবে, এমন কোনও নিশ্চিত প্রমাণ এখনও নেই।

বালোচিস্তান থেকে কেপি, পিওকে—একসঙ্গে ৪ ফ্রন্টে চাপে পাকিস্তান, বদলাবে কি মানচিত্র?

Pakistan Crisis

Published by: cloud_admin
  • Posted:August 13, 2026 1:04 pm
  • Update:August 13, 2026 1:04 pm
  • Facebook
  • Telegram
  • X
  • Whatsapp

বিদেশনীতি নিয়ে পাকিস্তান যতই সাফল্যের ছবি তুলে ধরুক, দেশের ভিতরের পরিস্থিতি নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ। বালোচিস্তান থেকে খাইবার পাখতুনখোয়া। পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীর থেকে অর্থনীতি। একসঙ্গে একাধিক ফ্রন্টে চাপের মুখে ইসলামাবাদ।

২০২৬ সালের মাঝামাঝি এসে এই সংকট আরও স্পষ্ট হয়েছে। বালোচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির তৎপরতা বেড়েছে। কেপিতে সক্রিয় তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান বা TTP। আর পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দাবিতে আন্দোলন হয়েছে।

এর সঙ্গে রয়েছে ঋণের বোঝা, দুর্বল অর্থনীতি এবং শাসনব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন। পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি সম্প্রতি দেশের বর্তমান গভর্ন্যান্স সিস্টেমকে ‘ধসে পড়েছে’ বলে মন্তব্য করেছেন।

তবে এই পরিস্থিতি থেকেই পাকিস্তানের মানচিত্র বদলে যাবে, এমন কোনও নিশ্চিত প্রমাণ এখনও নেই। বরং একাধিক অভ্যন্তরীণ সংকট একসঙ্গে তৈরি হওয়ায় ইসলামাবাদের জন্য বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

প্রথম ফ্রন্ট বালোচিস্তান, বাড়ছে BLA-র হামলা

পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রদেশ বালোচিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই অস্থির। বালোচ জাতীয়তাবাদী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলির সঙ্গে পাকিস্তানি রাষ্ট্রের সংঘাত বহু পুরনো।

এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত সংগঠন Baloch Liberation Army বা BLA। গত কয়েক বছরে সংগঠনটি পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনী এবং সরকারি পরিকাঠামোর বিরুদ্ধে হামলা বাড়িয়েছে।

২০২৬ সালের শুরুতেই বালোচিস্তানে একাধিক সমন্বিত হামলা হয়েছিল। সামরিক ঘাঁটি, পুলিশ স্টেশন, ব্যাঙ্ক এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করা হয়েছিল।

পরিস্থিতি যে কতটা খারাপ হয়েছে, সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানেই তার ছবি পাওয়া যায়। জানুয়ারি থেকে জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত বালোচিস্তানে ৭৬৫টি হিংসাত্মক ঘটনা এবং প্রায় ১,৬০০ জনের প্রাণহানির কথা রিপোর্টে উঠে এসেছে। একই সময়ে কেপিতে ৫৭৪টি হামলা ও ১,১৯৬ জন হতাহতের খবর রয়েছে।

অর্থাৎ বালোচিস্তান এখন পাকিস্তানের সবচেয়ে অস্থির অঞ্চলের অন্যতম। BLA-র পাশাপাশি TTP-র উপস্থিতিও কিছু এলাকায় বেড়েছে বলে নিরাপত্তা বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

তবে সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো ‘বালোচিস্তানের ৮৫ শতাংশ এলাকা বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে’ বা ‘৫ লক্ষ যোদ্ধার সেনা তৈরি হয়েছে’—এই দাবিগুলিকে স্বাধীন নির্ভরযোগ্য সূত্রে নিশ্চিত করা যায়নি। তাই এগুলিকে তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না।

দ্বিতীয় ফ্রন্ট খাইবার পাখতুনখোয়া, TTP-র বাড়বাড়ন্ত

পাকিস্তানের দ্বিতীয় বড় নিরাপত্তা সমস্যা খাইবার পাখতুনখোয়া। আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী এই প্রদেশে TTP-র সক্রিয়তা ইসলামাবাদের জন্য দীর্ঘদিনের মাথাব্যথা।

TTP পাকিস্তানি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই চালিয়ে আসছে। তাদের লক্ষ্য পাকিস্তানের বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থা বদলে নিজেদের ব্যাখ্যার ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠা করা।

আফগানিস্তানে তালিবান ক্ষমতায় ফেরার পর পাকিস্তান ও TTP-র সংঘাত আরও জটিল হয়েছে। পাকিস্তানের অভিযোগ, আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করে TTP হামলার পরিকল্পনা করছে। কাবুল অবশ্য এই অভিযোগের বিভিন্ন অংশ অস্বীকার করেছে।

২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে কেপিতে ৫৭৪টি হামলা এবং ১,১৯৬ জন হতাহতের তথ্য সামনে এসেছে। ফলে বালোচিস্তানের পাশাপাশি কেপিও পাকিস্তানের নিরাপত্তার অন্যতম বড় দুর্বল জায়গা হয়ে উঠেছে।

এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানকে নিজের দেশের ভিতরের জঙ্গিদের মোকাবিলা করার পাশাপাশি আফগানিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত উত্তেজনাও সামলাতে হচ্ছে।

অর্থাৎ, একটি নিরাপত্তা সমস্যা অন্য সমস্যাকে আরও জটিল করছে।

তৃতীয় ফ্রন্ট পিওকে, নির্বাচনের আগে রক্তাক্ত অস্থিরতা

তৃতীয় বড় চাপ তৈরি হয়েছে পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরে। সেখানে Joint Awami Action Committee বা JAAC-এর নেতৃত্বে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দাবিতে আন্দোলন চলছে।

মূল দাবিগুলির মধ্যে রয়েছে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং বিতর্কিত ১২টি সংরক্ষিত আসনের প্রশ্ন।

২০২৬ সালের নির্বাচনকে ঘিরে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে। ভোটের কয়েকটি পর্ব হিংসার কারণে পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ, রাস্তা অবরোধ এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার ঘটনা ঘটেছে।

রয়টার্সের সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ৫৩ আসনের বিধানসভায় পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন PML-N এগিয়ে রয়েছে। একইসঙ্গে সাতটি আসনে ভোট পিছিয়েছে। JAAC-এর দাবি, বিক্ষোভে ৩০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। পাকিস্তান সরকার অবশ্য এই সংখ্যা এবং বিক্ষোভের ব্যাখ্যা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে।

Financial Times-এর রিপোর্টেও বলা হয়েছে, পিওকে-তে সাম্প্রতিক বিক্ষোভে কয়েক ডজন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষোভ সেখানে আরও গভীর হয়েছে।

ফলে পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরও এখন ইসলামাবাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।

চতুর্থ ফ্রন্ট অর্থনীতি, ঋণ ও গভর্ন্যান্সের সংকট

সশস্ত্র সংঘাতের বাইরে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় সমস্যা অর্থনীতি।

দেশটির অর্থনীতি সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা স্থিতিশীল হলেও কাঠামোগত দুর্বলতা এখনও রয়েছে। বিশ্বব্যাঙ্ক বলছে, মুদ্রাস্ফীতি কমলেও উচ্চ জনসংখ্যা বৃদ্ধি, সীমিত রাজস্ব সক্ষমতা এবং বড় বৈদেশিক অর্থের প্রয়োজনের কারণে দারিদ্র্য কমানো কঠিন হয়ে রয়েছে।

পাকিস্তান এখনও IMF-এর সহায়তা ও সংস্কার কর্মসূচির উপর নির্ভরশীল। IMF-এর ২০২৬ সালের পর্যালোচনায় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার কিছু অগ্রগতির কথা বলা হয়েছে। একইসঙ্গে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ঝুঁকির প্রভাব নিয়েও সতর্ক করা হয়েছে।

সরকারি ঋণও বিশাল। ২০২৬ সালের শুরুতে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের ঋণ ৭৯ ট্রিলিয়ন পাকিস্তানি রুপিরও বেশি হয়েছিল বলে একটি বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গভর্ন্যান্স নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক। জুলাইয়ের শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি প্রকাশ্যেই বলেন, দেশের বর্তমান শাসনব্যবস্থা ‘ধসে পড়েছে’। তিনি প্রশাসনিক সংস্কার এবং নতুন প্রদেশ বা প্রশাসনিক ইউনিট তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন।

তবে এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। পাকিস্তানের অর্থনীতি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে—এমন ছবি এখনই আঁকা ঠিক হবে না। IMF কর্মসূচি এবং সংস্কারের ফলে কিছু ম্যাক্রো-ইকোনমিক স্থিতিশীলতা ফিরেছে। জুলাইয়ে S&P পাকিস্তানের সার্বভৌম ক্রেডিট রেটিং ‘B-’ থেকে ‘B’ করেছে।

তাই পাকিস্তানের সামনে এখন দ্বৈত বাস্তবতা। একদিকে নিরাপত্তা সংকট বাড়ছে। অন্যদিকে অর্থনীতি ধীরে ধীরে স্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এই পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা কতটা বাড়বে।

পাকিস্তানে সামরিক বাহিনী ঐতিহাসিকভাবেই রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী। বর্তমান সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরও দেশের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ভূমিকা পালন করছেন।

তবে আসিম মুনির সরাসরি নতুন করে সামরিক অভ্যুত্থানের প্রস্তুতি নিচ্ছেন—এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এখনও সামনে নেই।

অতএব, পাকিস্তানের মানচিত্র বদলে যাওয়ার প্রশ্নটি এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না। কিন্তু বালোচিস্তান, কেপি এবং পিওকে-তে একসঙ্গে অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক দুর্বলতা ইসলামাবাদের জন্য নিঃসন্দেহে বড় পরীক্ষা।

আগামী দিনে এই চারটি সংকটের কোনও একটি যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে তার প্রভাব শুধু পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। গোটা দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা সমীকরণেও তার প্রভাব পড়তে পারে।

আরও খবর