HIV Discrimination
এইচআইভি আক্রান্ত হওয়ার কারণেই কি কাজ হারাতে হল পশ্চিম মেদিনীপুরের এক অস্থায়ী স্বাস্থ্যকর্মীকে? এমনই গুরুতর অভিযোগ উঠেছে ঘাটাল মহকুমা হাসপাতালকে ঘিরে। হাসপাতালের এক অস্থায়ী কর্মীর দাবি, এইচআইভি আক্রান্ত জানার পর তাঁকে কাজে আসতে বারণ করা হয়েছে। বিষয়টি জানিয়ে নবান্ন এবং স্বাস্থ্য ভবনে অভিযোগও করেছেন তিনি।
অভিযোগ উঠেছে হাসপাতাল সুপারের বিরুদ্ধে। যদিও সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ঘাটাল মহকুমা হাসপাতালের সুপার মহেশ্বর মান্ডি। তাঁর দাবি, ওই কর্মী নিজেই কাজে আসছেন না। এইচআইভি আক্রান্ত হওয়ার কারণে কাউকে কাজ থেকে সরানো হয়নি।
বিষয়টি সামনে আসতেই প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। অভিযোগ সত্যি হলে এই ধরনের আচরণ কোনও ভাবেই বরদাস্ত করা হবে না বলে জানিয়েছেন তিনি। তাঁর কথায়, এইচআইভি আক্রান্তদের সামাজিক ভাবে বয়কট করা অত্যন্ত গুরুতর অন্যায়।
অভিযোগকারী স্বাস্থ্যকর্মীর দাবি, ২০০৭ সালে তিনি জানতে পারেন তাঁর শরীরে এইচআইভি সংক্রমণ হয়েছে। তারপর থেকেই নিয়মিত চিকিৎসার মধ্যে রয়েছেন তিনি। চিকিৎসা চললেও কর্মক্ষমতায় কোনও সমস্যা হয়নি বলে দাবি তাঁর।
ওই ব্যক্তির বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৯৬ সাল থেকেই তিনি ঘাটালের একটি সরকারি হাসপাতালে সাফাইকর্মী হিসাবে কাজ করছিলেন। পরবর্তী সময়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁকে সাফাইকর্মীর কাজ থেকে সরিয়ে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ওষুধ পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব দেয়।
অর্থাৎ, দীর্ঘ সময় ধরে এইচআইভি আক্রান্ত অবস্থাতেই তিনি হাসপাতালের বিভিন্ন কাজে যুক্ত ছিলেন বলে দাবি করেছেন ওই ব্যক্তি।
২০২৪ সালে সরকারি হাসপাতালের অস্থায়ী কর্মীদের স্থায়ীকরণ সংক্রান্ত একটি নির্দেশিকা জারি হয়। অভিযোগ, সেই নির্দেশিকা অনুযায়ী স্থায়ীকরণের জন্য আবেদন করার পর থেকেই তাঁর সঙ্গে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আচরণ বদলে যায়।
ওই কর্মীর দাবি, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে তাঁকে আর কাজে আসতে বারণ করা হয়। তাঁর অভিযোগ, এর পিছনে অন্যতম কারণ ছিল তাঁর এইচআইভি আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি।
তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
অভিযোগকারী আরও জানিয়েছেন, ঘাটাল মহকুমা হাসপাতালের এক মেডিক্যাল অফিসার তাঁকে ‘ফিট সার্টিফিকেট’ দিয়েছেন। অর্থাৎ, স্বাস্থ্যগত ভাবে তিনি কাজ করার উপযুক্ত বলে চিকিৎসকের শংসাপত্র রয়েছে বলে দাবি তাঁর।
এই পরিস্থিতিতে তাঁর প্রশ্ন, এত বছর ধরে কাজ করার পর হঠাৎ ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে কেন তিনি কাজের অযোগ্য হয়ে গেলেন?
শুধু কাজ থেকে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ নয়। মজুরি নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন ওই স্বাস্থ্যকর্মী।
তাঁর দাবি, ২০২২ সাল থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তাঁকে সারা মাস কাজ করিয়ে মাত্র ৬০০ টাকা দেওয়া হয়েছে। সরকারি হাসপাতালে একজন কর্মীর ক্ষেত্রে এই মজুরি কী ভাবে নির্ধারিত হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
ওই ব্যক্তির বক্তব্য, রাজ্য শ্রম দফতরের নিয়ম অনুযায়ী অদক্ষ শ্রমিকের দৈনিক মজুরি নির্দিষ্ট ন্যূনতম হারের নিচে হওয়ার কথা নয়। সেখানে একজন কর্মীকে সারা মাস কাজ করিয়ে মাত্র ৬০০ টাকা দেওয়ার অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর।
তাঁর প্রশ্ন, প্রতি মাসে ৬০০ টাকা করে তাঁর নামে কোন নিয়মে বরাদ্দ করা হয়েছিল? সেই টাকার নথিতে কারা সই করেছিলেন? এই বিষয়গুলির তদন্ত হওয়া প্রয়োজন বলে দাবি করেছেন তিনি।
প্রায় ৫০ বছর বয়সী ওই কর্মী আরও জানিয়েছেন, পরিবারে তাঁর স্ত্রী এবং দুই মেয়ে রয়েছেন। তিনিই পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। ফলে কাজ হারানোর পর পরিবার নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন তিনি।
তাঁর আরও দাবি, সরকারি বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্পের সুবিধাও তাঁর পরিবার নিয়মিত পায় না। ফলে চাকরি হারানোর পর আর্থিক চাপ আরও বেড়েছে।
ঘাটাল মহকুমা হাসপাতালের সুপার মহেশ্বর মান্ডি অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, অভিযোগকারীর ১৯৯৬ সাল থেকে কাজ করার দাবি সঠিক নয়। তাঁর মতে, ওই ব্যক্তি ২০১৬-১৭ সাল থেকে মজুরিভিত্তিক কাজ করতেন।
সুপারের দাবি, হাসপাতালের অনেক এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তি কাজ করেন। তাঁদের কাউকেই এইচআইভি আক্রান্ত হওয়ার কারণে কাজে আসতে বারণ করা হয়নি।
তিনি আরও দাবি করেন, ওই কর্মী নিজেই কাজে আসছেন না।
তবে কাজ করতে চাইলে তাঁকে ফের কাজে নেওয়া হবে কি না, সেই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি হাসপাতাল সুপারের কাছ থেকে।
অন্য দিকে, অভিযোগকারী সুপারের বক্তব্যের বিরোধিতা করেছেন। তাঁর দাবি, হাসপাতালের কর্মীদের সামনে সুপারই তাঁকে এইচআইভি আক্রান্ত হওয়ার কারণে কাজে রাখা যাবে না বলে জানিয়েছিলেন।
নিজের কাজের মেয়াদের প্রমাণ হিসাবে নবান্ন এবং স্বাস্থ্য ভবনে বিভিন্ন নথি জমা দিয়েছেন বলেও দাবি করেছেন তিনি। এমনকি ওয়ার্ড মাস্টারের তৈরি রস্টারেও তাঁর নাম রয়েছে বলে জানিয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি তুলেছেন ওই কর্মী। তাঁর বক্তব্য, নথিপত্র খতিয়ে দেখলেই কে সত্যি বলছেন, তা স্পষ্ট হয়ে যাবে।
এদিকে, বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, অভিযোগ সত্যি হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্যক্ষেত্রে এইচআইভি আক্রান্তদের প্রতি বৈষম্য একটি সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। তাঁর দাবি, অতীতেও এমন অভিযোগ সামনে আসার পর স্বাস্থ্য ভবন পদক্ষেপ করেছে।
মন্ত্রী আরও বলেন, এইচআইভি আক্রান্ত কোনও ব্যক্তিকে জড়িয়ে ধরলে অন্য ব্যক্তি সংক্রামিত হন না। তাই কোনও ব্যক্তিকে সামাজিক ভাবে বয়কট করা অত্যন্ত অন্যায়।
ঘাটালের অভিযোগেরও ভিত্তি থাকলে যথাযথ পদক্ষেপ করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
এখন তাই নজর তদন্তের দিকে। অভিযোগকারীর চাকরি কেন গেল, তাঁর এইচআইভি আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি কি সত্যিই কারণ ছিল, নাকি এর পিছনে অন্য প্রশাসনিক কারণ রয়েছে—তা তদন্তেই স্পষ্ট হবে।
একই সঙ্গে ৬০০ টাকা মাসিক মজুরির অভিযোগও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। কারণ, এই অভিযোগ সত্যি হলে শুধু বৈষম্য নয়, শ্রমিকের পারিশ্রমিক নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হবে।