Dharmendra Pradhan Row
অরিন্দম নাথ : রাজনীতিতে অনেক সময় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়াও বিপজ্জনক, আবার সিদ্ধান্ত না নেওয়াও সমান ঝুঁকির। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে ঘিরে বর্তমান বিতর্ক (Dharmendra Pradhan Row) অনেকটা সেই রকমই।
গত কয়েক বছরে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা একের পর এক প্রশ্নের মুখে পড়েছে। নিট পরীক্ষার অনিয়ম, ইউজিসি-নেট বাতিল, বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষাকে ঘিরে অভিযোগ— এই সবকিছু মিলিয়ে ছাত্রছাত্রী এবং অভিভাবকদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। ভারতের মতো দেশে, যেখানে একটি পরীক্ষার ফলাফল লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে, সেখানে এই ধরনের বিতর্ক নিছক প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি সামাজিক উদ্বেগেরও কারণ।
এই পরিস্থিতিতে বিরোধীরা শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করবেই। সেটি তাদের রাজনৈতিক কর্তব্যও বটে। কিন্তু বিজেপির সমস্যা অন্য জায়গায়। ধর্মেন্দ্র প্রধান কেবল একজন মন্ত্রী নন। তিনি দীর্ঘদিনের সংগঠক, দলের ভিতরে প্রতিষ্ঠিত মুখ এবং বৃহত্তর সঙ্ঘ পরিবারের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কযুক্ত নেতা। ফলে তাঁকে সরানো হলে সেই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক অভিঘাত মন্ত্রিসভার গণ্ডি ছাড়িয়ে দলীয় সংগঠন পর্যন্ত পৌঁছতে পারে।
তবে প্রশ্ন হল, একজন মন্ত্রীর রাজনৈতিক গুরুত্ব কি তাঁর প্রশাসনিক জবাবদিহির ঊর্ধ্বে হতে পারে?
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মন্ত্রীত্বের মূল ভিত্তি হল দায়বদ্ধতা। কোনও মন্ত্রকের অধীনে যদি বারবার বিতর্ক তৈরি হয়, তবে তার নৈতিক দায় এড়ানো কঠিন। অবশ্যই প্রতিটি অনিয়মের জন্য সরাসরি মন্ত্রীকে দায়ী করা যায় না। কিন্তু প্রশাসনিক ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি হলে দায়বদ্ধতার প্রশ্নও বারবার ফিরে আসে।
এখানেই বিজেপির অস্বস্তি। শিক্ষামন্ত্রীকে সরালে বিরোধীরা বলবে, সরকার ব্যর্থতা স্বীকার করেছে। আর না সরালে এই বার্তাও যেতে পারে যে রাজনৈতিক সমীকরণ প্রশাসনিক দায়বদ্ধতার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সমস্যার মূলেও রয়েছে অন্য এক সংকট। গত এক দশকে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি এমন একটি রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করেছে, যেখানে সরকারের সাফল্য যেমন প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হয়, তেমনই ব্যর্থতার দায়ও শেষ পর্যন্ত তাঁর নেতৃত্বের উপর এসে পড়ে। ফলে শিক্ষাক্ষেত্রের এই বিতর্ক দীর্ঘস্থায়ী হলে তার রাজনৈতিক মূল্য কেবল ধর্মেন্দ্র প্রধানকে নয়, সরকারকেও দিতে হতে পারে।
এ কথা সত্য যে, বিরোধীদের আন্দোলন বা সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত সমালোচনাই কোনও সরকারের সিদ্ধান্তের একমাত্র ভিত্তি হতে পারে না। কিন্তু ছাত্রসমাজের ক্ষোভকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করাও সম্ভব নয়। কারণ দেশের যুবসমাজ শুধু ভোটার নয়, ভবিষ্যতের অর্থনীতি ও সমাজের চালিকাশক্তি।
অতএব, বিষয়টি ধর্মেন্দ্র প্রধান থাকবেন না যাবেন— এই সরল প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। আসল প্রশ্ন হল, কেন্দ্রীয় সরকার কি শিক্ষাক্ষেত্রে তৈরি হওয়া আস্থার সংকট কাটাতে কোনও দৃশ্যমান ও বিশ্বাসযোগ্য পদক্ষেপ করতে পারছে?
মন্ত্রী বদল অনেক সময় রাজনৈতিক বার্তা দেয়, কিন্তু কাঠামোগত সমস্যার সমাধান করে না। আবার কোনও পদক্ষেপ না নেওয়াও সমস্যাকে দীর্ঘায়িত করতে পারে। তাই সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানকে পুনরায় বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা।
ভারতের ছাত্রসমাজ এখন সেটাই দেখতে চাইছে।