• ১৮ ভাদ্র ১৪৩৩
  • বৃহস্পতিবার
  • ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Rana Rauf ISI Network

ইসলামাবাদের নির্দেশে উত্তরবঙ্গ-কলকাতায় ISI-র ‘সেল’! নেপালি তরুণীকে বিয়ে করে নেটওয়ার্ক তৈরির অভিযোগ রানার

পাকিস্তানি নাগরিক রানা রউফ খালিদের বিরুদ্ধে উত্তরবঙ্গ ও কলকাতায় কথিত ISI ‘সেল’ তৈরির অভিযোগ খতিয়ে দেখছে STF। নেপালে থাকা যোগাযোগ, বাংলাদেশ হয়ে পাকিস্তান যাওয়ার পরিকল্পনা এবং Fort William-এর ছবি-মানচিত্র উদ্ধারের বিষয়ও তদন্তে রয়েছে।

ইসলামাবাদের নির্দেশে উত্তরবঙ্গ-কলকাতায় ISI-র ‘সেল’! নেপালি তরুণীকে বিয়ে করে নেটওয়ার্ক তৈরির অভিযোগ রানার

Rana Rauf ISI Network

Published by: cloud_admin
  • Posted:August 14, 2026 12:05 pm
  • Update:August 14, 2026 12:05 pm
  • Facebook
  • Telegram
  • X
  • Whatsapp

পাকিস্তানি নাগরিক রানা রউফ খালিদকে ঘিরে তদন্ত আরও বিস্তৃত হচ্ছে। হাবড়া থেকে গ্রেফতারের পর তাঁকে টানা জেরা করছে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের STF। তদন্তকারীদের দাবি, উত্তরবঙ্গ এবং কলকাতায় ISI-র ‘সেল’ তৈরির চেষ্টা করছিলেন রানা। এই কাজে ইসলামাবাদ থেকে নির্দেশ এসেছিল বলেও তদন্তকারীদের দাবি।

তবে এই সমস্ত অভিযোগ এখনও তদন্তাধীন। আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত রানা বা তাঁর কথিত সহযোগীদের দোষী বলা যায় না। পুলিশের দাবি অনুযায়ী, রানা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে লোক নিয়োগের চেষ্টা করছিলেন।
তদন্তকারীরা এখন সেই কথিত নেটওয়ার্কের পরিধি বোঝার চেষ্টা করছেন।

এর আগে তাঁর কাছ থেকে কলকাতার Fort William-এর ছবি এবং মানচিত্র উদ্ধারের দাবি সামনে এসেছিল। ফোর্ট উইলিয়াম ভারতীয় সেনার Eastern Command-এর সদর দফতর। তাই বিষয়টি জাতীয় নিরাপত্তার দিক থেকেও গুরুত্ব পেয়েছে।

শিলিগুড়িকে কেন্দ্র করে ‘সেল’ তৈরির অভিযোগ

STF-এর তদন্তে উঠে আসা দাবিই এখন সবচেয়ে বেশি চাঞ্চল্য তৈরি করেছে।
রানা নাকি শিলিগুড়িকে কেন্দ্র করে উত্তরবঙ্গ ও কলকাতায় যোগাযোগের নেটওয়ার্ক তৈরি করছিলেন। সেই নেটওয়ার্ককে তদন্তকারীরা ‘espionage cell’ হিসেবে দেখছেন।

পুলিশের দাবি, সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সম্ভাব্য লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হত।
আবার সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমেও নিয়োগের চেষ্টা চলত। কারা এই নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়েছিল, সেটিই এখন তদন্তের বড় প্রশ্ন। তদন্তকারীরা রানার মোবাইল এবং অন্যান্য ডিজিটাল তথ্য পরীক্ষা করছেন। কোনও যোগাযোগ মুছে ফেলা হয়েছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাকিস্তান, নেপাল এবং বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগের সূত্রও তদন্তে উঠে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

রানা ২০১২ সাল থেকে ভারতে ছিলেন বলে তদন্তকারীদের দাবি। এই দীর্ঘ সময়ের গতিবিধি এখন পুনর্গঠন করা হচ্ছে। তিনি কোথায় ছিলেন, কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন এবং কীভাবে পরিচয় তৈরি করেছিলেন, সবই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারীদের দাবি, রানার নেটওয়ার্ক শুধু একটি শহরকে ঘিরে ছিল না। উত্তরবঙ্গ থেকে কলকাতা পর্যন্ত বিস্তৃত যোগাযোগ তৈরির চেষ্টা হয়েছিল বলে অভিযোগ। সীমান্তবর্তী এলাকার অবস্থানও এই তদন্তে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

শিলিগুড়ি উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে দেশের অন্য অংশের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ কেন্দ্র।
রেল ও সড়ক যোগাযোগের দিক থেকেও শহরটির কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। তাই কোনও বিদেশি গুপ্তচরচক্র সেখানে সক্রিয় ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

নেপালে বিয়ে, একাধিক বিদেশি যোগাযোগের দাবি

তদন্তে আরও একটি ব্যক্তিগত তথ্য সামনে এসেছে। রানা নেপালের কাঠমান্ডুতে এক নেপালি মহিলাকে বিয়ে করেছিলেন বলে STF সূত্রে দাবি। ওই মহিলার নাম শিলু বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন। রানা নেপালে থাকার সময় সেখানকার একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন বলে অভিযোগ। তদন্তকারীরা দাবি করছেন, নেপালে থাকা কয়েকজন সন্দেহভাজন ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ ছিল।

তাঁদের সঙ্গে WhatsApp-এর মাধ্যমে কথোপকথনের তথ্যও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই যোগাযোগের উদ্দেশ্য কী ছিল, সেটিই এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তদন্তকারীদের দাবি, কয়েকজন ব্যক্তির নামে একাধিক দেশের SIM card ব্যবহারের তথ্য মিলেছে। নেপাল, শ্রীলঙ্কা এবং পাকিস্তানের SIM-এর কথাও সামনে এসেছে। তবে এই নম্বরগুলি বাস্তবে কারা ব্যবহার করত, তা ফরেন্সিক তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করতে হবে।

রানা নিজেও শিলিগুড়ি থেকে দুটি SIM card সংগ্রহ করেছিলেন বলে তদন্তকারীদের দাবি। পরে তাঁর মোবাইল নেপালে ভেঙে ফেলার অভিযোগও সামনে এসেছে।
কেন ফোনটি ভাঙা হয়েছিল, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

শিলিগুড়ির কয়েকজন SIM বিক্রেতাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন। তাঁদের কাছ থেকে রানার পরিচয় এবং SIM সংগ্রহের বিষয়ে তথ্য নেওয়া হচ্ছে।

এখানে তদন্তকারীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ডিজিটাল footprint।
ফোন ভেঙে ফেললেও সব তথ্য মুছে যায় না। Cloud backup, অন্য ডিভাইস, কল রেকর্ড এবং যোগাযোগের metadata থেকে অনেক তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

সেই কারণেই রানার ডিজিটাল যোগাযোগ এখন তদন্তের কেন্দ্রে রয়েছে।

এর আগে তদন্তকারীরা দাবি করেছিলেন, রানার কাছ থেকে Fort William-এর ছবি এবং মানচিত্র পাওয়া গিয়েছে। তাঁদের ডিজিটাল ডিভাইসে পাকিস্তান, নেপাল এবং শ্রীলঙ্কার যোগাযোগের সূত্রও পাওয়া গিয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

ঢাকা হয়ে করাচি যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল? তদন্তে নতুন মোড়

রানার গ্রেফতারির আগে তাঁর কথিত বিদেশযাত্রার পরিকল্পনা নিয়েও তদন্ত শুরু হয়েছে।
STF-এর দাবি, তিনি বাংলাদেশ হয়ে পাকিস্তানে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন।

তদন্তকারীদের মতে, বনগাঁ সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করার পরিকল্পনা ছিল।
সেখান থেকে ঢাকায় পৌঁছনোর কথা ছিল তাঁর। এরপর বিমানে করাচি যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। তদন্তকারীদের আরও দাবি, পাকিস্তানে পৌঁছে ইসলামাবাদে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল রানার। সেখানে ISI-এর আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠকের কথাও নাকি ছিল।

তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা এগিয়েছিল, তা এখনও স্পষ্ট নয়। বাংলাদেশে তাঁর কোনও সহযোগী ছিল কি না, সেটিও তদন্তাধীন। রানা গ্রেফতার হওয়ার সময় সীমান্ত পার হওয়ার আগেই আটক হন বলে তদন্তকারীদের দাবি। তাঁর সঙ্গে কলকাতা থেকে মহম্মদ ইজাজকেও গ্রেফতার করা হয়। ইজাজের ভূমিকা নিয়েও STF তদন্ত করছে।

তদন্তকারীদের দাবি, ইজাজ রানার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। তাঁদের সম্পর্ক কতটা পুরনো এবং কী ধরনের কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিল, তা জানতে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।

এই মামলায় এখন একাধিক স্তরে তদন্ত চলছে। একদিকে রানার ভারতে থাকার ইতিহাস খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে নেপাল, বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের সূত্র পরীক্ষা করা হচ্ছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হল, কথিত ‘সেল’-এ কতজন যুক্ত ছিল। তাঁদের মধ্যে কেউ ইতিমধ্যে ভারতে সক্রিয় কি না, সেটিও জানতে চাইছেন তদন্তকারীরা।

তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা জরুরি। কোনও ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ থাকা মানেই তিনি ISI-এর এজেন্ট, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। তদন্তকারীদের অভিযোগকে স্বাধীন প্রমাণ এবং আদালতের পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। ফোর্ট উইলিয়ামের ছবি ও মানচিত্র উদ্ধারের দাবিও তাই তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেগুলি কীভাবে সংগ্রহ করা হয়েছিল, কার কাছে পাঠানো হয়েছিল এবং সেগুলিতে কোনও সংবেদনশীল তথ্য ছিল কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।

এখন STF-এর সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তিনটি। প্রথমত, রানার কথিত নেটওয়ার্কে আর কারা ছিল? দ্বিতীয়ত, কোনও সামরিক বা সীমান্ত সংক্রান্ত তথ্য কি বিদেশে পাঠানো হয়েছিল? তৃতীয়ত, বাংলাদেশ ও নেপালের যোগাযোগগুলি কি বৃহত্তর কোনও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের অংশ?

এই প্রশ্নগুলির উত্তর মিললে তদন্তের আসল ছবি সামনে আসতে পারে।

স্বাধীনতা দিবসের আগে এই গ্রেফতারি হওয়ায় নিরাপত্তা সংস্থাগুলিও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। সেনা গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগিতায় তদন্ত চলছে বলে জানা গিয়েছে। তবে এখনই কোনও বড় নাশকতার ছক নিশ্চিত করে বলা যায় না। তদন্তকারীদের হাতে থাকা তথ্য এবং ফরেন্সিক প্রমাণই শেষ পর্যন্ত বিষয়টি স্পষ্ট করবে।

রানা রউফ খালিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সত্যি হলে এটি শুধু একজন সন্দেহভাজন চরকে ঘিরে ঘটনা নয়। বরং সীমান্ত পেরিয়ে একটি গুপ্তচর নেটওয়ার্ক তৈরির সম্ভাবনার দিকটি সামনে আসবে।

আর যদি অভিযোগের কিছু অংশ প্রমাণিত না হয়, তাহলেও তদন্ত থেকে সেই বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া জরুরি। কারণ জাতীয় নিরাপত্তার মতো সংবেদনশীল ঘটনায় তথ্য এবং প্রমাণের নির্ভুলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আরও খবর