NRS Nurse Death
কলকাতার এনআরএস মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে নার্সের রহস্যমৃত্যু ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। হাসপাতালের স্ত্রীরোগ বিভাগের HDU-তে কর্তব্যরত অবস্থায় মৃত্যু হয় রুপালি বর্মনের। বুধবার রাতে হাসপাতালের শৌচালয় থেকে তাঁর অচৈতন্য দেহ উদ্ধার হয়। পরে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
মৃত নার্সের শরীরে প্রাথমিক ভাবে কোনও আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তাঁর কাছ থেকে কোনও সুইসাইড নোটও মেলেনি বলে জানা গিয়েছে। তবে দেহের পাশে তাঁর মোবাইল ফোন পড়ে ছিল। ফলে কী কারণে তাঁর মৃত্যু হল, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে একাধিক প্রশ্ন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, মৃতার স্বামী রাহুল দাস ময়নাতদন্ত নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, এনআরএস হাসপাতালেই যেন স্ত্রীর দেহের ময়নাতদন্ত না করা হয়। অন্য কোনও হাসপাতালে ময়নাতদন্ত করার আর্জি জানিয়েছেন তিনি।
দমদমের বাসিন্দা রুপালি বর্মনের বুধবার রাতে ডিউটি ছিল। এনআরএসের স্ত্রীরোগ বিভাগের HDU-তে রাতের শিফটে ছিলেন তিনি। রাত ৮টা নাগাদ তাঁর ডিউটি শুরু হয়।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, রাত ১০টা ২০ মিনিট নাগাদ শৌচালয়ে যান রুপালি।এর পর বেশ কিছুটা সময় কেটে যায়। কিন্তু তিনি শৌচালয় থেকে বেরিয়ে আসেননি।
রাত ১০টা ২৭ মিনিট নাগাদ সহকর্মীরা তাঁকে ডাকতে শুরু করেন। কোনও সাড়াশব্দ না পাওয়ায় তাঁদের সন্দেহ হয়। এরপর শৌচালয়ের দরজা ভেঙে ভিতরে প্রবেশ করেন সহকর্মীরা। সেখানে অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায় রুপালিকে।
তাঁকে দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। তবে চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
ঘটনার পরেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। খবর যায় কলকাতা পুলিশের লালবাজারেও। এরপর তদন্তকারীদের একটি দল হাসপাতালে পৌঁছয়।
বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ও এনআরএস হাসপাতালে যান। পুলিশের উচ্চপদস্থ আধিকারিকেরাও ঘটনাস্থলে পৌঁছন। অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম) কুণাল অগ্রবাল এবং ডিসি (ইস্ট সাবার্বান) সুবিমল পাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
নার্স রুপালির মৃত্যু নিয়ে তদন্তে উঠে এসেছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। হাসপাতাল সূত্রে দাবি, ডিউটিতে যোগ দেওয়ার পর তিনটি ফেন্টানিলের ভায়াল নিয়েছিলেন তিনি।
এরপর সেই ভায়াল নিয়ে শৌচালয়ের দিকে চলে যান। ফেন্টানিল একটি শক্তিশালী opioid ওষুধ। হাসপাতালে এটি নির্দিষ্ট চিকিৎসার প্রয়োজনে ব্যবহার করা হয়।
বিশেষ করে ব্যথা নিয়ন্ত্রণ এবং নির্দিষ্ট চিকিৎসা পরিস্থিতিতে এই ওষুধ দেওয়া হয়।
হাসপাতাল সূত্রে আরও জানা গিয়েছে, রুপালির শরীরে ফেন্টানিল প্রয়োগ করা হয়ে থাকতে পারে বলে চিকিৎসকদের প্রাথমিক অনুমান। কনুইয়ের সন্ধিস্থলের শিরায় ইনজেকশনের চিহ্ন থাকার কথাও জানা গিয়েছে।
তবে এই তথ্য এখনও তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ফেন্টানিল কীভাবে তাঁর শরীরে গিয়েছিল, সেটি নিশ্চিত করতে ফরেন্সিক এবং ময়নাতদন্তের রিপোর্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল, রুপালি কেন তিনটি ভায়াল নিয়ে শৌচালয়ে গিয়েছিলেন। ওষুধগুলি তিনি কীভাবে সংগ্রহ করেছিলেন, সেটিও তদন্তের বিষয়। ওষুধ ব্যবহারের নিয়ম মানা হয়েছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তবে শুধুমাত্র এই তথ্যের ভিত্তিতে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। ময়নাতদন্ত এবং ভিসেরা পরীক্ষার রিপোর্টের পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ স্পষ্ট হতে পারে।
স্ত্রীর মৃত্যুর কারণ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন রুপালির স্বামী রাহুল দাস। তিনি এনআরএস কর্তৃপক্ষকে নিজের আপত্তির কথা জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, এনআরএসে যেন স্ত্রীর দেহের ময়নাতদন্ত না করা হয়। পরিবারের এই আপত্তির পর ময়নাতদন্ত কোথায় হবে, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরিবার যেখানে চাইবে, সেখানেই ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করা হবে।
পুলিশও জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের জায়গা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। পরিবারের মতামতকে গুরুত্ব দিয়েই পরবর্তী পদক্ষেপ করা হবে।
এদিকে তদন্তের স্বার্থে ঘটনাস্থল সিল করে দিয়েছে পুলিশ। অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম) জানিয়েছেন, হোমিসাইড শাখা তদন্ত শুরু করেছে। মোট তিনটি জায়গাকে ঘটনাস্থল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তিনটিই সিল করে দেওয়া হয়েছে।
ঘটনাস্থল থেকে একটি স্ট্রেচারও পুলিশ বাজেয়াপ্ত করেছে। হাসপাতালের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। রুপালি কখন কোথায় গিয়েছিলেন, কার সঙ্গে কথা বলেছিলেন, কীভাবে ওষুধ নিয়েছিলেন, সবই খতিয়ে দেখা হবে।
তদন্তকারীরা হাসপাতালের ডিউটি রোস্টার এবং নার্সিং স্টেশনের তথ্যও পরীক্ষা করতে পারেন। ফেন্টানিলের ভায়ালগুলি কোথা থেকে নেওয়া হয়েছিল, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
ওষুধের স্টক এবং ব্যবহারের রেকর্ড পরীক্ষা করা হতে পারে।
পাশাপাশি রুপালির মোবাইল ফোনও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। মৃত্যুর আগে তিনি কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, তা খতিয়ে দেখা হতে পারে। তাঁর কল রেকর্ড এবং অন্যান্য ডিজিটাল তথ্যও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
এই ঘটনায় আপাতত আত্মহত্যা, দুর্ঘটনা অথবা অন্য কোনও সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছে না তদন্তকারীরা। তবে কোনও সম্ভাবনাকেই এখনও চূড়ান্ত বলে ধরা হয়নি।
রুপালির পরিবারের সন্দেহের কারণও তদন্তের অংশ। মৃত্যুর আগে তাঁর মানসিক অবস্থা কেমন ছিল, তা জানার চেষ্টা হবে। সহকর্মী এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন তদন্তকারীরা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ময়নাতদন্ত। কারণ শরীরে ফেন্টানিলের মাত্রা কত ছিল, তা জানা অত্যন্ত জরুরি। ওষুধটি কীভাবে শরীরে প্রবেশ করেছিল, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
ফলে এই মুহূর্তে NRS Nurse Death-এর তদন্তে একাধিক প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে।
নার্সের শৌচালয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে দেহ উদ্ধারের পুরো ঘটনাক্রম খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পরিবারের আপত্তির পর ময়নাতদন্ত অন্য হাসপাতালে হলে তদন্ত আরও নিরপেক্ষ হবে বলে আশা করছে পরিবার। তবে শেষ পর্যন্ত ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং ফরেন্সিক তথ্যই মৃত্যুর আসল কারণ নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।
তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত রুপালির মৃত্যুকে আত্মহত্যা বা অন্য কোনও নির্দিষ্ট কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক হবে না। পুলিশের তদন্ত এবং ময়নাতদন্তের রিপোর্টের দিকেই এখন নজর।