Gold Recycling India
নয়াদিল্লি: ভারতীয়দের কাছে সোনা শুধু অলঙ্কার নয়, এটি আবেগ, বিনিয়োগ এবং সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। বিয়ে, উৎসব, উত্তরাধিকার কিংবা সঞ্চয়—সব ক্ষেত্রেই সোনার গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু এই সোনার প্রতি প্রবল আকর্ষণই এখন দেশের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই কারণেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্প্রতি দেশবাসীর কাছে একটি বিশেষ আবেদন জানিয়েছেন। তিনি নতুন সোনা কেনার পরিবর্তে ঘরে থাকা অব্যবহৃত সোনা পুনর্ব্যবহার বা রিসাইকেল (Gold Recycling India) করার আহ্বান জানিয়েছেন।
ভারতীয় পরিবার এবং বিভিন্ন মন্দিরে মিলিয়ে প্রায় ৩২ হাজার টন সোনা মজুত রয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ সোনার বড় অংশই বছরের পর বছর লকার বা আলমারিতে পড়ে থাকে এবং অর্থনীতিতে কোনও কার্যকর ভূমিকা পালন করে না। কেন্দ্রের মতে, এই সোনা যদি পুনর্ব্যবহার করা যায়, তাহলে বিদেশ থেকে নতুন সোনা আমদানির প্রয়োজন অনেকটাই কমে যাবে।
ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সোনা আমদানিকারক দেশ। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে দেশ প্রায় ৭২ বিলিয়ন ডলারের সোনা আমদানি করেছে, যা মোট আমদানি ব্যয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। এই বিপুল আমদানির জন্য প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করতে হয়। বর্তমানে পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতা, অপরিশোধিত তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং রুপির ওপর চাপের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার রক্ষা করা সরকারের কাছে বড় অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সোনা এমন একটি পণ্য যা ভারত প্রায় সম্পূর্ণভাবে আমদানির উপর নির্ভর করে। ফলে সোনার চাহিদা যত বাড়ে, ততই দেশের ডলার খরচ বাড়ে। প্রধানমন্ত্রী মোদি আগেই দেশবাসীকে এক বছরের জন্য অপ্রয়োজনীয় সোনা কেনা স্থগিত রাখার আবেদন জানিয়েছিলেন। এবার সেই ভাবনাকেই আরও বাস্তব রূপ দিতে তিনি সোনা রিসাইক্লিংয়ের উপর জোর দিচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, যদি দেশের পরিবার ও মন্দিরে থাকা মোট সোনার মাত্র ১ শতাংশও প্রতি বছর পুনর্ব্যবহার (Gold Recycling India) করা যায়, তাহলে ভারতের সোনা আমদানি ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এর ফলে কয়েক বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং চলতি হিসাব ঘাটতি বা Current Account Deficit নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করবে।
ইতিমধ্যেই সরকার সোনা আমদানিতে শুল্ক বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করেছে। এই সিদ্ধান্তের লক্ষ্যও আমদানি কমানো এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ হ্রাস করা। যদিও শিল্পমহলের একাংশের আশঙ্কা, অতিরিক্ত শুল্কের ফলে চোরাচালান বাড়তে পারে। তবে কেন্দ্রের যুক্তি, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখতে কিছু কঠোর পদক্ষেপ জরুরি।
জুয়েলারি শিল্পের প্রতিনিধিরাও মনে করছেন, সম্পূর্ণ নতুন সোনা কেনার পরিবর্তে পুরনো গয়না বদল বা রিসাইক্লিং একটি বাস্তবসম্মত সমাধান হতে পারে। এতে ক্রেতাদের চাহিদাও পূরণ হবে, আবার নতুন সোনা আমদানির প্রয়োজনও কমবে। ইতিমধ্যেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পুরনো সোনা বিনিময় করে নতুন গয়না তৈরির প্রবণতা বাড়ছে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।
অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক সংকটের সময়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার রক্ষা করতে নাগরিকদের অংশগ্রহণ প্রয়োজন বলেই মনে করছে কেন্দ্র। সেই লক্ষ্যেই প্রধানমন্ত্রী মোদির এই নতুন বার্তা—নতুন সোনা নয়, আগে কাজে লাগানো হোক ঘরে থাকা সোনার ভাণ্ডার।