Human Animal Conflict
মধ্যপ্রদেশকে বলা হয় ভারতের ‘টাইগার স্টেট’। বাঘ সংরক্ষণে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য এটি। কিন্তু সেই রাজ্যেই এখন বাড়ছে মানুষ-বন্যপ্রাণী সংঘাত। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে বন্যপ্রাণীর হামলায় ৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে অন্তত ৪৫টি বাঘেরও মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ বিপদ শুধু মানুষের জন্য নয়। বন্যপ্রাণীরাও এই সংঘাতের শিকার হচ্ছে।
মধ্যপ্রদেশ বন দফতরের সাম্প্রতিক তথ্যেই উঠে এসেছে এই উদ্বেগজনক ছবি। মানুষ এবং বন্যপ্রাণীর বসবাসের এলাকা যত কাছাকাছি আসছে, তত বাড়ছে সংঘাতের সম্ভাবনা।
৫০টি মানবমৃত্যুর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে বাঘের হামলায়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাঘের আক্রমণে ২২ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
এর পরে রয়েছে বন্য শূকর। বন্য শূকরের হামলায় মৃত্যু হয়েছে আট জনের।
হাতির হামলায় প্রাণ গিয়েছে সাত জনের। স্লথ ভালুকের আক্রমণে মৃত্যু হয়েছে চার জনের। এক জনের মৃত্যু হয়েছে চিতাবাঘের হামলায়।
অর্থাৎ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ তৈরি করছে বাঘ। তবে সংঘাতের তালিকায় রয়েছে একাধিক বন্যপ্রাণী। মৃতদের মধ্যে মহিলা ও কিশোরীর সংখ্যাও রয়েছে। ৫০ জন মৃতের মধ্যে অন্তত ১৬ জন ছিলেন মহিলা বা কিশোরী। এই সংখ্যাই পরিস্থিতির সামাজিক দিকটি আরও স্পষ্ট করছে।
গ্রাম এবং জঙ্গল লাগোয়া এলাকায় বসবাসকারী মানুষই মূলত সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ, চাষের কাজ এবং জঙ্গলের সম্পদের উপর নির্ভরতা বাড়ায় সেই ঝুঁকি।
মানুষের মৃত্যুর পাশাপাশি ৪৫টি বাঘের মৃত্যু আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করছে।
মধ্যপ্রদেশ ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাঘের আবাসস্থলগুলির একটি। বাঘের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের বিচরণক্ষেত্র নিয়েও চাপ বাড়ছে। বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি অবশ্যই সংরক্ষণের সাফল্য। কিন্তু সেই সাফল্যের সঙ্গে নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি হয়েছে।
বাঘ যখন নিজের এলাকা ছেড়ে বাইরে বেরোয়, তখন মানুষের সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। জঙ্গল সংলগ্ন কৃষিজমি, গ্রাম এবং রাস্তার আশপাশে তখন বাঘের উপস্থিতি দেখা যায়। অন্যদিকে, মানুষের বসতি ও পরিকাঠামোও ধীরে ধীরে জঙ্গলের কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে।
এই দুই প্রবণতা একসঙ্গে চললে সংঘাত বাড়ে। শুধু বাঘ নয়। বন্য শূকর, হাতি, ভালুক এবং চিতাবাঘও খাবার ও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে মানুষের এলাকায় ঢুকে পড়তে পারে।
ফলে সংঘাতের চরিত্রও বদলাচ্ছে। এটি এখন আর শুধু ‘বাঘ বনাম মানুষ’-এর সমস্যা নয়। এটি হয়ে উঠছে একটি বৃহত্তর Human Animal Conflict বা মানুষ-বন্যপ্রাণী সংঘাত।
এখানেই রয়েছে সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য। বাঘ সংরক্ষণে ভারত উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে অনেক অঞ্চলে তাদের পুরনো আবাসস্থলের বাইরেও বিচরণ বাড়ছে। কিন্তু সেই নতুন এলাকা সবসময় নিরাপদ নয়। বন্যপ্রাণীর করিডর ভেঙে গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়।
একটি বনাঞ্চল থেকে অন্য বনাঞ্চলে যাওয়ার প্রাকৃতিক পথ নষ্ট হলে প্রাণীরা মানুষের বসতির মধ্যে ঢুকে পড়তে পারে। রাস্তা, রেললাইন, খনি, কৃষিজমি এবং নতুন বসতি এই করিডরগুলির উপর চাপ তৈরি করে। ফলে বন্যপ্রাণীর চলাচলের জায়গা কমে যায়।
একই সঙ্গে মানুষের জঙ্গল নির্ভরতাও পুরোপুরি কমেনি। এই পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র বন্যপ্রাণীকে দোষ দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে বন্যপ্রাণীর নিরাপদ চলাচলের জায়গাও রাখতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সংঘাত কমাতে দ্রুত সতর্কবার্তা ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। বাঘ বা অন্য কোনও বড় প্রাণীর গতিবিধি নজরে রাখতে প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ানো দরকার।
স্থানীয় মানুষকে দ্রুত সতর্ক করা গেলে অনেক দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। জঙ্গল লাগোয়া এলাকায় আলো, ক্যামেরা, নজরদারি এবং প্রশিক্ষিত বনকর্মীর উপস্থিতিও বাড়াতে হবে।
তবে এর সঙ্গে আরও একটি বিষয় জরুরি। স্থানীয় মানুষের ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসন ব্যবস্থা দ্রুত করতে হবে। কারণ বন্যপ্রাণীর হামলায় একজন মানুষের মৃত্যু শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। তার সঙ্গে একটি পরিবারের আয়, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ জড়িয়ে থাকে।
একইভাবে একটি বাঘের মৃত্যু সংরক্ষণ ব্যবস্থার জন্যও বড় ক্ষতি। মধ্যপ্রদেশের বর্তমান পরিসংখ্যান তাই একটি বড় সতর্কবার্তা। বাঘ সংরক্ষণ সফল হয়েছে বলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।
বরং বাঘের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সহাবস্থানের নতুন মডেল তৈরি করতে হবে। নইলে ‘টাইগার স্টেট’-এর সাফল্যই একদিন নতুন সংঘাতের কারণ হয়ে উঠতে পারে। এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ভারসাম্য।
মানুষকে নিরাপদ রাখতে হবে। বাঘকেও নিরাপদ রাখতে হবে। কারণ শেষ পর্যন্ত এই লড়াই মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির নয়। এটি এমন একটি ব্যবস্থা তৈরির লড়াই, যেখানে দু’পক্ষই টিকে থাকতে পারে। মধ্যপ্রদেশের ৫০ মানুষের মৃত্যু এবং ৪৫টি বাঘের মৃত্যু সেই প্রয়োজনের কথাই আরও একবার মনে করিয়ে দিচ্ছে।