• ১৮ ভাদ্র ১৪৩৩
  • বৃহস্পতিবার
  • ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Former Maoists

লাল-সন্ত্রাসের দিন শেষ, বন্দুক ছেড়ে র‍্যাম্পে প্রাক্তন মাওবাদীরা! হ্যান্ডলুম শাড়িতে নতুন জীবনের বার্তা

একসময় বস্তারের জঙ্গলে মাওবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাঁরা। এবার ছত্তিশগড়ের রায়পুরে National Handloom Day-এর ফ্যাশন শোয়ে হ্যান্ডলুম শাড়ি পরে র‍্যাম্পে হাঁটলেন প্রাক্তন মহিলা মাওবাদীরা। ভিডিও ভাইরাল হতেই প্রশংসা নেটদুনিয়ায়।

লাল-সন্ত্রাসের দিন শেষ, বন্দুক ছেড়ে র‍্যাম্পে প্রাক্তন মাওবাদীরা! হ্যান্ডলুম শাড়িতে নতুন জীবনের বার্তা

Former Maoists

Published by: cloud_admin
  • Posted:August 13, 2026 4:27 pm
  • Update:August 13, 2026 4:47 pm
  • Facebook
  • Telegram
  • X
  • Whatsapp

এক সময় জঙ্গল ছিল তাঁদের ঠিকানা। হাতে থাকত বন্দুক। বস্তারের গভীর জঙ্গলে কেটে যেত দিনের পর দিন। মাওবাদী আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তাঁরা। কিন্তু সেই জীবন এখন অতীত।

এবার তাঁদের দেখা গেল সম্পূর্ণ অন্য ভূমিকায়। হাতে বন্দুক নয়। পরনে হ্যান্ডলুম শাড়ি।
মঞ্চে উঠে একেবারে পেশাদার মডেলের মতো র‍্যাম্পে হাঁটলেন প্রাক্তন মহিলা মাওবাদীরা।

ছত্তিশগড়ের রাজধানী রায়পুরে আয়োজিত একটি ফ্যাশন শোয়ের এই দৃশ্য এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল।

ন্যাশনাল হ্যান্ডলুম ডে উপলক্ষে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানেই অংশ নেন এক সময় মাওবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন মহিলা।

তাঁদের র‍্যাম্পে হাঁটার ভিডিও সামনে আসতেই শুরু হয়েছে আলোচনা। অনেকেই বলছেন, এই দৃশ্য শুধু একটি ফ্যাশন শো নয়। এটি তাঁদের জীবন বদলের প্রতীক। অস্ত্র ছেড়ে সমাজের মূলস্রোতে ফেরার বার্তাও রয়েছে এই ঘটনায়।

বস্তারের জঙ্গল থেকে র‍্যাম্পে

এক সময় ছত্তিশগড়ের বস্তার ছিল মাওবাদী আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি।
ঘন জঙ্গল এবং দুর্গম পাহাড়ি এলাকা ছিল তাঁদের কার্যকলাপের কেন্দ্র। সেই পরিবেশেই বহু মহিলা মাওবাদী বছরের পর বছর জীবন কাটিয়েছেন।

তাঁদের জীবন ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। জঙ্গলেই থাকতে হত। নিরাপত্তার জন্য বদলাতে হত অবস্থান। প্রতিনিয়ত চলত পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের আশঙ্কা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি বদলেছে। অনেক মাওবাদী অস্ত্র ছেড়ে আত্মসমর্পণের পথ বেছে নিয়েছেন।
তাঁদের পুনর্বাসনের মাধ্যমে সমাজের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এই প্রাক্তন মহিলা মাওবাদীদের কয়েকজনই এবার ফ্যাশন শোয়ে অংশ নিলেন। হ্যান্ডলুম শাড়িতে তাঁদের আত্মবিশ্বাসী হাঁটা নজর কেড়েছে দর্শকদের। র‍্যাম্পে তাঁদের দেখে অনেকেই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। কারণ কয়েক বছর আগেও এমন দৃশ্য কল্পনা করা কঠিন ছিল। যাঁদের পরিচয় একসময় অস্ত্র এবং জঙ্গলের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল, তাঁরাই এখন প্রকাশ্যে স্বাভাবিক জীবনের অংশ হয়ে উঠেছেন।

তাঁদের এই পরিবর্তনকে তাই শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং এটি পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার একটি দৃশ্যমান ফল হিসেবেও সামনে এসেছে।

হ্যান্ডলুম শাড়িতে নতুন পরিচয়

গত ৭ অগস্ট পালিত হয়েছে National Handloom Day। দেশের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পকে তুলে ধরতেই এই দিনটি পালন করা হয়। দেশের বিভিন্ন জায়গায় আয়োজন করা হয় নানা অনুষ্ঠান। হ্যান্ডলুম পোশাককে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টাও হয়।

রায়পুরের ফ্যাশন শো-ও ছিল সেই উদ্যোগের অংশ। তবে অনুষ্ঠানে প্রাক্তন মাওবাদীদের উপস্থিতি আলাদা মাত্রা যোগ করেছে। এক সময় যাঁরা জঙ্গলের পোশাকেই অভ্যস্ত ছিলেন, তাঁরাই এবার পরলেন হ্যান্ডলুম শাড়ি। র‍্যাম্পে তাঁদের আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি নজর কেড়েছে। দর্শকদের হাততালিতেও স্পষ্ট ছিল উৎসাহ।

এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁদের সামনে এসেছে নতুন পরিচয়। তাঁরা আর শুধুই প্রাক্তন মাওবাদী নন। তাঁরা এখন সমাজের মূলস্রোতে ফিরতে চাওয়া সাধারণ মানুষ। নিজেদের জীবন নতুন করে সাজানোর চেষ্টা করছেন।

এই পরিবর্তনের পিছনে আত্মসমর্পণ এবং পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
অস্ত্র ছাড়ার পর নতুন জীবনে মানিয়ে নেওয়া সহজ নয়। বিশেষ করে দীর্ঘদিন জঙ্গলে থাকা মানুষের কাছে সাধারণ সামাজিক জীবন সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা।

তাই কর্মসংস্থান, প্রশিক্ষণ এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফ্যাশন শোয়ের মতো একটি অনুষ্ঠান সেই সামাজিক পুনর্মিলনের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।

‘লাল সন্ত্রাস’ থেকে শান্তির পথে বস্তার

এক সময় বস্তারকে মাওবাদী কার্যকলাপের অন্যতম শক্ত ঘাঁটি হিসেবে দেখা হত। এই অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা বাহিনী এবং মাওবাদীদের সংঘর্ষ চলেছে। হিংসার প্রভাব পড়েছে স্থানীয় মানুষের জীবনেও।

তবে গত কয়েক বছরে পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। বহু মাওবাদী আত্মসমর্পণ করেছেন। নিরাপত্তা অভিযানও জোরদার হয়েছে। একই সঙ্গে পুনর্বাসনের উপর জোর দেওয়া হয়েছে।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ একাধিকবার দাবি করেছেন, দেশকে মাওবাদীমুক্ত করার লক্ষ্যে সরকার এগিয়ে চলেছে। বস্তারেও তিনি মাওবাদী হিংসার অবসানের কথা বলেছেন।

এই পরিবর্তনের মূল্যায়ন নিয়ে অবশ্য রাজনৈতিক মতপার্থক্য রয়েছে। সরকার যেখানে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতির কথা বলছে, সেখানে মানবাধিকার সংগঠনগুলি পুনর্বাসন এবং স্থানীয় মানুষের অধিকার নিয়েও প্রশ্ন তোলে।

তবে প্রাক্তন মাওবাদীদের র‍্যাম্পে হাঁটার এই দৃশ্য একটি বিষয় স্পষ্ট করে। অস্ত্র ছেড়ে সমাজে ফিরে আসার পর নতুন পরিচয় তৈরি করার সুযোগ প্রয়োজন।

আত্মসমর্পণের পর শুধুমাত্র অস্ত্র জমা দিলেই পুনর্বাসন সম্পূর্ণ হয় না। তাঁদের জীবিকা দরকার। প্রশিক্ষণ দরকার। সমাজের গ্রহণযোগ্যতাও দরকার। এই জায়গায় এমন উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

কারণ এক সময়ের জঙ্গলজীবন থেকে র‍্যাম্পে উঠে আসা সহজ পরিবর্তন নয়। এর পিছনে রয়েছে দীর্ঘ পথ। আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত। নতুন জীবন শুরু করার সাহস। এবং সমাজের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক তৈরি করার চেষ্টা।

সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া ভিডিও তাই শুধু একটি ফ্যাশন শোয়ের দৃশ্য নয়।
এটি বহু মানুষের কাছে পরিবর্তনের একটি প্রতীক হয়ে উঠেছে।

যাঁরা একসময় বন্দুক হাতে জঙ্গলে ঘুরতেন, তাঁদের হাতে এখন নেই অস্ত্র। পরিবর্তে রয়েছে নতুন জীবনের স্বপ্ন। হ্যান্ডলুম শাড়িতে র‍্যাম্পে তাঁদের হাঁটা সেই বার্তাই যেন সামনে নিয়ে এসেছে—সহিংসতার জীবন ছেড়ে সমাজের মূলস্রোতে ফিরে আসাও সম্ভব।

তবে এই পথ দীর্ঘ। পুনর্বাসনকে সফল করতে ধারাবাহিক সরকারি সহায়তা প্রয়োজন।
প্রয়োজন স্থানীয় মানুষের আস্থা। প্রয়োজন কাজের সুযোগ এবং সামাজিক মর্যাদা।

রায়পুরের এই ফ্যাশন শো সেই বৃহত্তর পরিবর্তনের একটি ছোট কিন্তু দৃশ্যমান উদাহরণ।
বস্তারের জঙ্গলে একসময় যে জীবন বন্দুকের ছায়ায় কেটেছে, সেই জীবন এখন রঙিন র‍্যাম্পে নতুন গল্প বলছে।

আরও খবর