rising sea levels Kolkata Mumbai
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাব আর ভবিষ্যতের কোনও দূরবর্তী আশঙ্কা নয়। তা ইতিমধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন উপকূলীয় অঞ্চলে বাস্তব হয়ে উঠেছে। আর এই জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম বড় ঝুঁকিতে রয়েছে ভারতের দুই গুরুত্বপূর্ণ শহর কলকাতা ও মুম্বই। রাষ্ট্রপুঞ্জের সাম্প্রতিক রিপোর্টে সতর্ক করা হয়েছে, সমুদ্রের জলস্তর বাড়তে থাকলে এই দুই শহরের লক্ষ লক্ষ মানুষ স্থায়ী জলমগ্নতার কারণে ঘরবাড়ি হারানোর ‘তাৎক্ষণিক ঝুঁকিতে’ রয়েছেন।
রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিবের ‘Challenges related to sea level rise and ways and approaches to address it’ শীর্ষক রিপোর্টে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিকে বিশ্বের অন্যতম গভীর ও দ্রুত বাড়তে থাকা বিপদ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের সাম্প্রতিক ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার নিচু বদ্বীপ শহরগুলির মধ্যে কলকাতা, মুম্বই ও ঢাকা বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। এই তিন শহরে মিলিয়ে ১৪ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ ঘরবাড়ি, জীবিকা এবং জীবন হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন।
শুধু বসতিই নয়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়লে উপকূলীয় পরিকাঠামো, বন্দর, পানীয় জলের উৎস, কৃষি, মৎস্যজীবী সম্প্রদায় এবং স্থানীয় অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনই সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রধান কারণ। হিমবাহ ও বরফের স্তর গলে সমুদ্রে অতিরিক্ত জল যোগ হওয়ার পাশাপাশি উষ্ণ সমুদ্রের জল তাপীয় প্রসারণের কারণে আয়তনে বাড়ছে। ফলে সমুদ্রের জলস্তর ক্রমশ দ্রুত বাড়ছে।
রাষ্ট্রপুঞ্জের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপৃষ্ঠ গড়ে বছরে ৪.৭ মিলিমিটার করে বেড়েছে। ২০২৪ সালে সেই হার আরও বেড়ে রেকর্ড ৫.৯ মিলিমিটারে পৌঁছেছিল। অর্থাৎ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির গতি কমার বদলে আরও ত্বরান্বিত হচ্ছে।
রাষ্ট্রপুঞ্জের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি শুধুমাত্র পরিবেশগত সমস্যা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা, মানবাধিকার, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং মানুষের নিজস্ব পরিচয়ের প্রশ্নও।
উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রের জল ঢুকে পড়লে মিষ্টি জলের উৎসে লবণাক্ততা বাড়তে পারে। কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। মাছ ধরা এবং পর্যটননির্ভর অর্থনীতিতেও বড় ধাক্কা আসতে পারে। একই সঙ্গে বন্যা ও উপকূলীয় ভাঙনের কারণে মানুষকে বসতভিটা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে হতে পারে।
গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা বদ্বীপ অঞ্চলের অংশ হিসেবে কলকাতা একটি নিচু উপকূলীয় ভূপ্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত। ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উপকূলীয় জলমগ্নতা এবং চরম আবহাওয়ার ঘটনা একসঙ্গে শহর ও আশপাশের অঞ্চলের উপর চাপ বাড়াতে পারে।
রাষ্ট্রপুঞ্জ স্পষ্ট করেছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিকে শুধুমাত্র উপকূল রক্ষার বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না। নদী অববাহিকা, মিষ্টি জলের ব্যবস্থা, উপকূল, সমুদ্র এবং নগর পরিকল্পনাকে একসঙ্গে বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদি নীতি তৈরি করতে হবে।
রাষ্ট্রপুঞ্জের বার্তা হল, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কিছুটা প্রভাব ইতিমধ্যেই অনিবার্য হয়ে উঠেছে। কিন্তু ভবিষ্যতে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে এখন বিশ্ব কত দ্রুত গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমাতে পারে এবং উপকূলীয় শহরগুলিকে কতটা কার্যকরভাবে অভিযোজিত করতে পারে তার উপর।
কলকাতা ও মুম্বইয়ের মতো জনবহুল শহরের ক্ষেত্রে তাই উপকূলীয় পরিকাঠামো শক্তিশালী করা, জলনিকাশি ব্যবস্থার উন্নতি, বন্যা মোকাবিলার পরিকল্পনা, মিষ্টি জলের সুরক্ষা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার জন্য দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা এখনই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রাষ্ট্রপুঞ্জের সতর্কবার্তা মূলত একটি বিষয়ই স্পষ্ট করছে—সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি আর ভবিষ্যতের বিপদ নয়; জলবায়ু পরিবর্তনের এই প্রভাব ইতিমধ্যেই মানুষের দরজায় পৌঁছে গিয়েছে।