• ১৮ ভাদ্র ১৪৩৩
  • বৃহস্পতিবার
  • ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Ananta Maharaj

‘যদি কাউকে কষ্ট দিয়ে থাকি…’, বঙ্গবিভূষণ হারাতেই সুরবদল অনন্ত মহারাজের, নেতাজি মন্তব্যে দুঃখপ্রকাশ

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে বঙ্গবিভূষণ হারিয়েছেন বিজেপি সাংসদ অনন্ত মহারাজ। সম্মান প্রত্যাহারের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিও বার্তা দিয়ে নিজের মন্তব্যে কেউ আঘাত পেয়ে থাকলে আন্তরিক ভাবে দুঃখপ্রকাশ করেছেন তিনি।

‘যদি কাউকে কষ্ট দিয়ে থাকি…’, বঙ্গবিভূষণ হারাতেই সুরবদল অনন্ত মহারাজের, নেতাজি মন্তব্যে দুঃখপ্রকাশ

Ananta Maharaj

Published by: cloud_admin
  • Posted:August 14, 2026 12:21 pm
  • Update:August 14, 2026 12:21 pm
  • Facebook
  • Telegram
  • X
  • Whatsapp

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করে প্রবল চাপে রাজ্যসভার বিজেপি সাংসদ অনন্ত মহারাজ। বৃহস্পতিবার রাজ্য সরকার তাঁর বঙ্গবিভূষণ সম্মান প্রত্যাহার করে নেয়। তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিও বার্তা দেন অনন্ত মহারাজ। সেখানে নিজের মন্তব্য নিয়ে দুঃখপ্রকাশ করেন তিনি।

অনন্ত মহারাজের আসল নাম নগেন্দ্রনাথ রায়। নেতাজি এবং আজাদ হিন্দ ফৌজ সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য ঘিরেই বিতর্কের সূত্রপাত। তাঁর বক্তব্যের পর রাজ্যজুড়ে সমালোচনা শুরু হয়। একাধিক থানায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগও দায়ের হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

এরপরই রাজ্য সরকার তাঁর বঙ্গবিভূষণ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়। সরকারি নির্দেশে অনন্ত মহারাজের নাম সম্মানপ্রাপকদের তালিকা থেকেও বাদ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর ফলে তিনি আর নিজেকে বঙ্গবিভূষণ প্রাপক হিসেবে দাবি করতে পারবেন না।

নেতাজিকে নিয়ে ঠিক কী মন্তব্য করেছিলেন অনন্ত মহারাজ?

অনন্ত মহারাজ দাবি করেছিলেন, শুধু মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু বা কংগ্রেসের আন্দোলনের কারণে ভারত স্বাধীন হয়নি। তিনি কোচবিহারের মহারাজার ভূমিকা ইতিহাসে যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি বলেও দাবি করেন।

এর পরেই নেতাজি এবং আজাদ হিন্দ ফৌজ নিয়ে তাঁর মন্তব্য বিতর্ক তৈরি করে।
তাঁর দাবি ছিল, জার্মানির হাতে বন্দি ভারতীয় সেনাদের নিয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজ তৈরি হয়েছিল। নেতাজি সেই সুযোগের ‘অপব্যবহার’ করেছিলেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এমনকি কোচবিহারের মহারাজা যুদ্ধ করে হিটলার এবং আজাদ হিন্দ ফৌজকে পরাজিত করেছিলেন বলেও দাবি করেন অনন্ত। আরও বলেন, স্বাধীন ভারতের সম্রাট হিসেবে কোচবিহারের মহারাজাকে দায়িত্ব দেওয়া হলে দেশভাগ হত না। ভারত ও পাকিস্তান একসঙ্গে থাকত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এই মন্তব্যের পরেই শুরু হয় তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক। নেতাজিকে নিয়ে এমন মন্তব্য কেন করা হল, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। নেতাজির ঐতিহাসিক ভূমিকা অস্বীকার করার অভিযোগও ওঠে অনন্ত মহারাজের বিরুদ্ধে। তবে অনন্ত মহারাজ প্রথমে নিজের বক্তব্য প্রত্যাহার করেননি। বরং তিনি আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা করেন। তিনি দাবি করেন, নেতাজিকে অপমান করার কোনও উদ্দেশ্য তাঁর ছিল না।

তাঁর বক্তব্য ছিল, তিনি ইতিহাসের তথ্যই সামনে রেখেছেন। নিজে কোনও মনগড়া গল্প তৈরি করেননি বলেও দাবি করেছিলেন তিনি। এমনকি অন্যায় হয়ে থাকলে আইনি শাস্তি দেওয়ার কথাও বলেন।

কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়।

বঙ্গবিভূষণ প্রত্যাহার, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দুঃখপ্রকাশ

বৃহস্পতিবার রাজ্য সরকার অনন্ত মহারাজের বঙ্গবিভূষণ সম্মান প্রত্যাহার করে নেয়।
২০২৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তাঁকে এই সম্মান দেওয়া হয়েছিল। রাজ্যের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মানগুলির মধ্যে অন্যতম এই পুরস্কার।

সরকারি নির্দেশে বলা হয়েছে, কিছু নতুন তথ্য ও পরিস্থিতি সরকারের নজরে এসেছে।
সেগুলি বিবেচনা করে অনন্ত মহারাজের হাতে সম্মানটি রাখা মর্যাদা এবং উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মনে করেছে সরকার। এর পরেই আসে অনন্ত মহারাজের ভিডিও বার্তা।

সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত সেই ভিডিওতে তিনি বলেন, নেতাজির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি নিজের বক্তব্য নিয়ে দুঃখপ্রকাশ করছেন। তাঁর বক্তব্যে কেউ মানসিক ভাবে আঘাত পেয়ে থাকলে তার জন্য আন্তরিক ভাবে দুঃখিত বলেও জানান তিনি।

অর্থাৎ, বঙ্গবিভূষণ প্রত্যাহারের পর তাঁর অবস্থানে স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা গেল। এর আগে তিনি নিজের বক্তব্যকে ঐতিহাসিক তথ্য হিসেবে ব্যাখ্যা করছিলেন। পরে সেই বক্তব্যের জন্য প্রকাশ্যে দুঃখপ্রকাশ করলেন।

এই ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, সরকারি সম্মান হারানোর পরেই কি অবস্থান বদলালেন অনন্ত মহারাজ?

নেতাজি বিতর্কে কড়া বার্তা রাজ্য সরকারের

অনন্ত মহারাজের মন্তব্যের পর রাজ্য সরকারও কঠোর অবস্থান নেয়। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নেতাজিকে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য বরদাস্ত করা হবে না বলে বার্তা দেন। তিনি পুলিশকে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে জানা গিয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, রাজনৈতিক পরিচয় বা পদমর্যাদা দেখে আইনের প্রয়োগ বদলাবে না। সাংসদ, বিধায়ক, রাজনৈতিক নেতা বা সরকারি আধিকারিক—সবার ক্ষেত্রেই আইন সমান বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এর আগেও অনন্ত মহারাজের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়েরের খবর সামনে আসে।
তাই বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক বিতর্কে আটকে থাকেনি। আইনি পদক্ষেপের সম্ভাবনাও তৈরি হয়।

এর মধ্যেই বঙ্গবিভূষণ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
কারণ মাত্র কয়েক মাস আগেই অনন্ত মহারাজকে এই সম্মান দেওয়া হয়েছিল। তৎকালীন তৃণমূল সরকারের আমলে তিনি সম্মানটি পেয়েছিলেন।

বর্তমানে রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্তে সেই সম্মান বাতিল হয়েছে। সরকারি তালিকা থেকে তাঁর নাম সরানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। সম্মানের সঙ্গে যুক্ত কোনও বিশেষ স্বীকৃতি, সুবিধা বা মর্যাদাও তিনি আর দাবি করতে পারবেন না।

নেতাজি প্রসঙ্গে অনন্ত মহারাজের মন্তব্য তাই নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করেছে।
একদিকে ইতিহাসের ব্যাখ্যা নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। অন্যদিকে জাতীয় নেতাকে নিয়ে প্রকাশ্য মন্তব্যের সীমা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অনন্ত মহারাজের সাম্প্রতিক দুঃখপ্রকাশ সেই বিতর্ককে আরও নতুন মাত্রা দিয়েছে।
তিনি স্পষ্ট ভাবে বলেছেন, কাউকে মানসিক ভাবে আঘাত করার উদ্দেশ্য তাঁর ছিল না।
কিন্তু তাঁর বক্তব্যের কারণে যে প্রবল প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, তা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট।

এখন নজর থাকবে তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া অভিযোগের দিকে। পাশাপাশি রাজ্য সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়, সেদিকেও নজর রাজনৈতিক মহলের।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, দুঃখপ্রকাশের পর কি বিতর্ক কিছুটা থামবে? নাকি নেতাজি নিয়ে তাঁর আগের মন্তব্যকে ঘিরে আইনি এবং রাজনৈতিক চাপ চলতেই থাকবে?

এই মুহূর্তে একটি বিষয় নিশ্চিত। বঙ্গবিভূষণ প্রত্যাহারের পর অনন্ত মহারাজ নিজের বক্তব্যের বিষয়ে আগের তুলনায় অনেক নরম অবস্থান নিয়েছেন। আর তাঁর ‘যদি কাউকে কষ্ট দিয়ে থাকি’ মন্তব্য ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।

আরও খবর