Rana Rauf ISI Spy
হাবড়া থেকে সন্দেহভাজন পাকিস্তানি নাগরিক রানা রউফকে গ্রেফতার ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের STF তাঁকে গ্রেফতার করেছে। তাঁর আসল নাম ওয়াহাব আলম বলেও তদন্তকারীদের দাবি। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য।
তদন্তকারীদের দাবি, জেরায় রানা জানিয়েছেন তাঁর স্বপ্ন ছিল পাকিস্তান সেনায় যোগ দেওয়া। কিন্তু শারীরিক সমস্যার কারণে সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। এর পর অন্যভাবে দেশের জন্য কাজ করার ইচ্ছা থেকেই ISI-এর সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হয় বলে অভিযোগ।
তবে এই সমস্ত দাবি এখনও তদন্তের অংশ। আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না।
স্বাধীনতা দিবসের ঠিক আগে এই গ্রেফতারি আরও গুরুত্ব পেয়েছে।
কারণ তদন্তকারীদের দাবি, তাঁর কাছ থেকে ফোর্ট উইলিয়ামের ছবি ও মানচিত্র উদ্ধার হয়েছে। সেনা, BSF এবং রেল পরিকাঠামো সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
STF সূত্রের দাবি অনুযায়ী, পাকিস্তানের ফয়সলাবাদের বাসিন্দা রানা রউফ। ছোটবেলা থেকেই দেশের জন্য কাজ করার ইচ্ছা ছিল তাঁর। সেই কারণেই পাকিস্তান সেনায় যোগ দেওয়ার স্বপ্ন দেখতেন বলে জেরায় জানিয়েছেন তিনি। কিন্তু শারীরিক সমস্যার কারণে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে পারেননি বলে তদন্তকারীদের দাবি। এর পরেও দেশের জন্য কাজ করার ইচ্ছা ছিল বলে পুলিশকে জানিয়েছেন তিনি। সেই পথেই নাকি ISI-এর সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হয়।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। এই বক্তব্য পুলিশের জেরায় পাওয়া বলে দাবি করা হচ্ছে। এর স্বাধীন প্রমাণ এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। তাই তদন্তকারীদের অভিযোগ এবং আদালতে প্রমাণিত তথ্যকে আলাদা করে দেখা জরুরি।
পশ্চিমবঙ্গ STF বুধবার হাবড়া থেকে রানা রউফকে গ্রেফতার করে। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগে মহম্মদ ইজাজ নামের আরও এক ব্যক্তিকেও আটক করা হয়েছে।
ইজাজ তপসিয়ায় থাকতেন বলে তদন্তকারীদের দাবি। পুলিশের দাবি, রানা দীর্ঘদিন নেপালে ছিলেন। ২০১২ সালে ব্যবসায়ী পরিচয়ে সেখানে থাকার কথা জানা গিয়েছে।
পরে ইজাজের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন।
এর পর ইজাজের সূত্র ধরে তিনি কলকাতায় আসেন বলে অভিযোগ। তদন্তকারীদের দাবি, নিজের পরিচয় গোপন করতে ভুয়ো নথি ব্যবহার করেছিলেন রানা। তাঁর পরিচয় এবং ভারতে থাকার বৈধতা নিয়েও তদন্ত চলছে।
এই দীর্ঘ সময়ের গতিবিধিই এখন তদন্তকারীদের নজরে। তিনি কার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন, কোথায় যেতেন এবং কী তথ্য সংগ্রহ করতেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে ফোর্ট উইলিয়াম সংক্রান্ত তথ্য।
তদন্তকারীদের দাবি, রানার কাছ থেকে ফোর্ট উইলিয়ামের ছবি ও মানচিত্র উদ্ধার হয়েছে।
ফোর্ট উইলিয়াম ভারতীয় সেনার ইস্টার্ন কমান্ডের সদর দফতর। তাই এই তথ্য উদ্ধারের বিষয়টি নিরাপত্তা সংস্থাগুলি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।
তদন্তকারীরা এখন খতিয়ে দেখছেন, কেন ওই ছবি এবং মানচিত্র সংগ্রহ করা হয়েছিল।
সেগুলি কারও কাছে পাঠানো হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের বিষয়। শুধু ছবি বা মানচিত্র থাকা মানেই গুপ্তচরবৃত্তি প্রমাণিত হয় না। কিন্তু সেগুলি কীভাবে সংগ্রহ করা হয়েছিল, সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
STF আরও অভিযোগ করছে, রানা সেনা এবং সীমান্ত নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করতেন। BSF ছাউনি, রেলস্টেশন এবং রেলপথ সম্পর্কিত তথ্যও তাঁর নজরে ছিল বলে তদন্তকারীদের দাবি। এই তথ্যের কোনও অংশ বিদেশে পাঠানো হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তকারীরা নেপাল এবং বাংলাদেশে থাকা কয়েকজনের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের বিষয়টিও দেখছেন। তবে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগের প্রকৃতি এবং তাঁরা সত্যিই কোনও গুপ্তচক্রের অংশ কি না, তা এখনও তদন্তাধীন। রানার মোবাইল ফোন এবং অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইসও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। পুলিশের দাবি, নিজের সঙ্গীদের আড়াল করতে তিনি একটি মোবাইল ফোন ভেঙে ফেলেছিলেন। তবে তদন্তকারীরা তাঁর নোটবুক থেকে আরও কয়েকজনের নাম পেয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
তদন্তকারীদের দাবি, সেই তালিকায় নেপাল ও বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ থাকা কয়েকজনের নাম রয়েছে। এই নামগুলির সঙ্গে রানার সম্পর্ক কী ছিল, তা এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ইতিমধ্যে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তা নেওয়া হচ্ছে বলেও রিপোর্টে জানা গিয়েছে।
তদন্তকারীরা ফোন নম্বর, সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট এবং অন্যান্য ডিজিটাল সূত্র পরীক্ষা করছেন। অর্থাৎ এই মামলার তদন্ত এখন শুধু রানা রউফকে ঘিরে নেই। তাঁর সঙ্গে যুক্ত সম্ভাব্য যোগাযোগের নেটওয়ার্কও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
STF-এর দাবি, জেরায় রানা বাংলাদেশ যাওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। বনগাঁ সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে যাওয়ার কথা ছিল বলে তদন্তকারীদের দাবি।
বাংলাদেশে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য একজন ব্যক্তি অপেক্ষা করছিলেন বলেও পুলিশ সূত্রে দাবি করা হয়েছে। তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা এগিয়েছিল, সেটি এখনও তদন্তাধীন। এই সূত্রটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ রানা দীর্ঘদিন নেপালে থাকার পর ভারতে এসেছিলেন বলে তদন্তকারীরা দাবি করছেন।এখন বাংলাদেশ-যোগের অভিযোগ সামনে আসায় তাঁর আন্তর্জাতিক যোগাযোগের পরিধিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তবে এই পর্যায়ে কোনও নির্দিষ্ট বিদেশি ব্যক্তিকে গুপ্তচর হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক হবে না।
তদন্তকারীদের হাতে পাওয়া তথ্য এবং আদালতের প্রমাণের ভিত্তিতেই শেষ সিদ্ধান্ত হবে।
এই মামলায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, রানা কী ধরনের তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন।
কোনও সামরিক স্থাপনার নিরাপত্তা সংক্রান্ত তথ্য কি তাঁর হাতে ছিল? সেই তথ্য বিদেশে পাঠানো হয়েছিল কি? কোনও নাশকতার পরিকল্পনার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল কি?
এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি।
স্বাধীনতা দিবসের আগে ফোর্ট উইলিয়াম সংক্রান্ত ছবি-মানচিত্র উদ্ধারের বিষয়টি তাই নিরাপত্তা মহলে গুরুত্ব পাচ্ছে। তদন্তকারীরা এখন ডিজিটাল প্রমাণ এবং যোগাযোগের সূত্র মিলিয়ে দেখছেন। এই মামলার সঙ্গে আরও এক ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে।
মহম্মদ ইজাজকে রানা রউফের সহযোগী হিসেবে সন্দেহ করছে STF। তাঁর সঙ্গে রানার যোগাযোগ কীভাবে তৈরি হয়েছিল, সেটিও তদন্তের অংশ।
পুলিশের দাবি, কলকাতায় রানার থাকার ক্ষেত্রে ইজাজের ভূমিকা ছিল। তাঁদের যোগাযোগ কতদিনের এবং কী ধরনের ছিল, তা জানতে জেরা করা হচ্ছে। এদিকে রানা রউফ এবং তাঁর সহযোগীকে আদালতে পেশ করা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে তাঁদের হেফাজতে নেওয়া এবং জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে।
তবে পুরো ঘটনায় এখনই কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো কঠিন। কারণ পুলিশের অভিযোগের পাশাপাশি ফরেন্সিক এবং ডিজিটাল প্রমাণও গুরুত্বপূর্ণ হবে।
একজন সন্দেহভাজন ব্যক্তির দাবি বা জেরার বক্তব্য একাই গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ প্রমাণ করে না। প্রমাণ করতে হবে, তিনি সত্যিই কোনও বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করছিলেন কি না। তাঁর সংগ্রহ করা তথ্য কোথায় গিয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ফোর্ট উইলিয়ামের ছবি-মানচিত্র, দীর্ঘদিন ভারতে থাকার অভিযোগ এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের সূত্র মিলিয়ে তদন্তকারীরা বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন।
এখন নজর তদন্তের পরবর্তী ধাপে। রানা রউফের সঙ্গে আর কারা যুক্ত ছিলেন?কী তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল? সেগুলি কি দেশের বাইরে পাঠানো হয়েছিল? এই প্রশ্নগুলির উত্তর মিললেই গোটা চক্রের ছবি আরও স্পষ্ট হবে।