Nirmal Ghosh Arrest
আরজি কর মামলায় নতুন করে বড়সড় মোড়। পানিহাটির প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক নির্মল ঘোষকে গ্রেফতার করল পুলিশ। বৃহস্পতিবার ওড়িশার পুরীর কাছে একটি হোটেল থেকে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। মৃত চিকিৎসক-ছাত্রীর দেহ তড়িঘড়ি সৎকারের অভিযোগে এই গ্রেফতারি।
মৃতার বাবা খড়দহ থানায় নতুন অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই নির্মল ঘোষ-সহ তিন জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। এর পরেই তদন্তে সক্রিয় হয় ব্যারাকপুর পুলিশ কমিশনারেট। অবশেষে ওড়িশা থেকে নির্মলকে গ্রেফতার করা হল।
তবে এই মামলা মূল আরজি কর ধর্ষণ-খুন মামলার থেকে আলাদা। মূল ধর্ষণ ও খুনের মামলায় CBI তদন্ত করছে। সেই মামলায় সঞ্জয় রায় ইতিমধ্যেই দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন।
তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মৃত চিকিৎসকের পরিবারের অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু ২০২৪ সালের ৯ অগস্ট। সেদিনই তরুণী চিকিৎসকের দেহের শেষকৃত্য হয়। পরিবারের অভিযোগ, তাঁদের সম্মতি এবং প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও দ্রুত দাহ করা হয়েছিল।
এই অভিযোগ নিয়েই নতুন করে তদন্ত শুরু হয়েছে। সোমবার খড়দহ থানায় মৃতার বাবা লিখিত অভিযোগ করেন। সেখানে নির্মল ঘোষের পাশাপাশি সোমনাথ দে এবং সঞ্জীব মুখোপাধ্যায়ের নাম রয়েছে। অভিযোগের মধ্যে দেহ বেআইনিভাবে আটকে রাখা, তথ্যপ্রমাণ নষ্ট করা এবং শ্মশানে অনধিকার প্রবেশের মতো বিষয় রয়েছে।
FIR দায়ের হওয়ার পর নির্মল কলকাতা ছেড়ে ওড়িশায় চলে যান বলে পুলিশ সূত্রে দাবি।
তদন্তকারীদের নজর এড়াতে তিনি ফোন এবং সিম বদলেছিলেন বলে জানা গিয়েছে।
পুরনো ফোনটি বন্ধ করে রেখেছিলেন বলেও পুলিশ সূত্রে খবর। নতুন ফোন ব্যবহার করে কয়েকজন ঘনিষ্ঠের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন তিনি।
তদন্তকারীরা মোবাইল টাওয়ারের সূত্র ধরে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে জানতে পারেন। এর পরেই ওড়িশায় পুলিশি অভিযান চালানো হয়। পুরীর কাছের একটি হোটেল থেকে তাঁকে আটক করা হয়। গ্রেফতারির সময় কোনও বড় ধরনের সংঘর্ষের খবর নেই।
পুলিশ তাঁকে ওড়িশার আদালতে পেশ করে ট্রানজিট রিমান্ড চাইতে পারে। এর পর তাঁকে কলকাতায় এনে তদন্ত এগোনোর কথা। ব্যারাকপুর আদালতে তাঁকে পেশ করা হতে পারে বলেও জানা গিয়েছে।
এই গ্রেফতারির ফলে নতুন মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।
আরজি করের তরুণী চিকিৎসকের মৃত্যুর পর তাঁর দেহ সৎকার নিয়ে শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন উঠেছিল। মৃতার পরিবার বহুবার অভিযোগ করেছে, দেহ দ্রুত শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তাঁদের বক্তব্য, পরিবারের সদস্যদের শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয়নি।
পরিবারের আরও অভিযোগ, দ্বিতীয় ময়নাতদন্তের সম্ভাবনাও সেই সময় বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। এই অভিযোগকে কেন্দ্র করেই নতুন আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
মে মাসেও মৃতার পরিবার আদালতের কাছে নির্মল ঘোষ-সহ তিন জনের গ্রেফতারি এবং জিজ্ঞাসাবাদ দাবি করেছিল।
তবে সৎকারের সময় পরিবারের সম্মতি ছিল কি না, সেই বিষয়েও বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য রয়েছে। CBI-এর এক আধিকারিক আগেই জানিয়েছিলেন, শ্মশান কর্তৃপক্ষের দাবি ছিল পরিবারের সম্মতিতেই দাহ করা হয়েছিল।
ফলে এই নতুন তদন্তে নথিপত্র এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পুলিশ এখন খতিয়ে দেখছে, সেদিন শ্মশানে ঠিক কী ঘটেছিল। কে দেহ নিয়ে গিয়েছিলেন?
কার নির্দেশে দ্রুত সৎকারের ব্যবস্থা হয়েছিল? পরিবারের সঙ্গে তখন কী ধরনের যোগাযোগ হয়েছিল? এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা।
এছাড়াও শ্মশানের রেজিস্টার, প্রয়োজনীয় নথি এবং সেই সময়ের ফোন যোগাযোগ খতিয়ে দেখা হতে পারে। নতুন FIR-এর ভিত্তিতে তদন্ত কোন দিকে যায়, এখন সেটাই দেখার।
সম্প্রতি এই অভিযোগ নিয়ে সরব হয়েছিলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী।
তিনি সৎকারের প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে তদন্তের দাবি জানিয়েছিলেন।
এর পরেই বিষয়টি নতুন করে রাজনৈতিক এবং আইনি গুরুত্ব পায়।
নির্মল ঘোষের বিরুদ্ধে অবশ্য এটিই একমাত্র মামলা নয়। তাঁর ছেলে তীর্থঙ্কর ঘোষকেও গত জুলাইয়ে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। দক্ষিণেশ্বর এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। একাধিক পুরনো মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে তোলাবাজি, মারধর, ভয় দেখানো এবং লটারির টিকিট ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পানিহাটি থেকে তৃণমূলের প্রার্থীও ছিলেন তীর্থঙ্কর। তবে তিনি বিজেপি প্রার্থী তথা মৃত চিকিৎসকের মায়ের কাছে হেরে যান।
নির্মল ঘোষ নিজেও গত জুলাইয়ে গ্রেফতারি এড়াতে কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। তিনি গ্রেফতারির বিরুদ্ধে সুরক্ষা চেয়েছিলেন বলে রিপোর্টে জানা যায়।
এবার অবশ্য তাঁকে ওড়িশা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে চলা বিভিন্ন অভিযোগের পাশাপাশি আরজি করের নতুন মামলাটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল।
নির্মল ঘোষ পানিহাটির দীর্ঘদিনের তৃণমূল নেতা। ২০১১, ২০১৬ এবং ২০২১ সালে তিনি ওই কেন্দ্র থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হননি। তাঁর বদলে ছেলে তীর্থঙ্করকে প্রার্থী করেছিল তৃণমূল।
এখন নতুন মামলায় তদন্তকারীরা নির্মলকে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৯ অগস্টের ঘটনাক্রম জানতে তাঁকে প্রশ্ন করা হতে পারে। শ্মশানে তাঁর ভূমিকা কী ছিল, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে মনে রাখা প্রয়োজন, গ্রেফতার হওয়া মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। নির্মল ঘোষের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হতে হবে। তদন্ত শেষ হওয়ার পরই পুরো ঘটনার আইনি ছবি আরও স্পষ্ট হবে।