Dhupguri TMC Leader
স্বাধীনতা দিবসের আগে উত্তরবঙ্গের ধূপগুড়িতে বিতর্কিত মন্তব্য ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এক তৃণমূল নেতা সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও পোস্ট করেছেন বলে অভিযোগ। সেখানে উত্তরবঙ্গে বসবাসকারী বাঙালিদের ১৫ অগাস্টের মধ্যে এলাকা ছাড়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ওই তৃণমূল নেতার নাম সুকদেব রায়। তাঁর বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। অভিযোগের ভিত্তিতে ধূপগুড়ি থানায় লিখিত অভিযোগও জমা পড়েছে। পুলিশ সূত্রে খবর, বিষয়টি নিয়ে স্বতঃপ্রণোদিত মামলা রুজু করা হয়েছে।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। বিরোধী দলগুলি এই মন্তব্যকে উসকানিমূলক বলে দাবি করেছে। একইসঙ্গে প্রশাসনের কাছে দ্রুত তদন্তের দাবিও জানানো হয়েছে।
অভিযোগ, নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইলে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন সুকদেব রায়। সেই ভিডিওতে উত্তরবঙ্গে বসবাসকারী বাঙালিদের উদ্দেশে তিনি হুঁশিয়ারি দেন বলে অভিযোগ।
আগামী ১৫ অগাস্টের মধ্যে বাঙালিদের উত্তরবঙ্গ ছাড়ার কথা বলা হয়েছে বলে দাবি অভিযোগকারীদের। এখানেই শেষ নয়। বক্তব্যের সময় ধূপগুড়িতে ২০০২ সালে ঘটে যাওয়া কেএলও হামলার প্রসঙ্গও তোলা হয় বলে অভিযোগ।
এই মন্তব্য সামনে আসতেই ধূপগুড়িতে ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর বিভিন্ন মহল থেকে প্রতিবাদ শুরু হয়।
একদল যুবক ইতিমধ্যেই ধূপগুড়ি থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, এই ধরনের বক্তব্য উত্তরবঙ্গে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে ভয় ও আতঙ্ক তৈরি করতে পারে।
পুলিশ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে বলে জানা গিয়েছে। অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হয়েছে। একইসঙ্গে পুলিশের পক্ষ থেকেও স্বতঃপ্রণোদিত মামলা করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে দাবি করা হয়েছে।
তবে এখনও পর্যন্ত সুকদেব রায়ের পক্ষ থেকে তাঁর বক্তব্যের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। তাঁকে ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি বলে অভিযোগকারীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
সুকদেব রায়ের বক্তব্য ঘিরে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছে ২০০২ সালের একটি পুরনো ঘটনার প্রসঙ্গ টানায়।
২০০২ সালের ১৭ অগাস্ট ধূপগুড়িতে সিপিআইএমের দলীয় কার্যালয়ে কেএলও জঙ্গিদের হামলার ঘটনা ঘটেছিল। অতর্কিত ওই হামলায় কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছিল বলে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের দাবি।
ঘটনার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সেই হামলার স্মৃতি এখনও ধূপগুড়ির রাজনৈতিক পরিসরে রয়েছে। সিপিআইএমের দলীয় কার্যালয়ের ভিতরে থাকা একটি স্টিলের আলমারিতে এখনও গুলির চিহ্ন রয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
সেই ঘটনার সঙ্গে বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক মন্তব্যের যোগসূত্র টানাকে ঘিরেই নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
বিরোধীদের অভিযোগ, এই ধরনের বক্তব্য শুধুমাত্র রাজনৈতিক আক্রমণ নয়। এর মাধ্যমে সামাজিক বিভাজনের পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
সিপিআইএমের ধূপগুড়ি এরিয়া কমিটির সম্পাদক জয়ন্ত মজুমদার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, এই ধরনের মন্তব্য সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার চেষ্টা।
তিনি আরও দাবি করেছেন, বাংলাকে ভাগ করার কোনও চক্রান্ত বরদাস্ত করা হবে না। বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি ফের সক্রিয় হলে তার বিরুদ্ধে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
সিপিআইএমের আরও দাবি, সুকদেব রায়ের বক্তব্যের পিছনে কোনও বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের যোগাযোগ রয়েছে কি না, তা প্রশাসনের খতিয়ে দেখা উচিত।
তৃণমূল নেতার মন্তব্যের বিরোধিতা করেছে বিজেপিও। জলপাইগুড়ি জেলা বিজেপির সম্পাদক মাধবচন্দ্র রায় এই বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছেন।
তাঁর অভিযোগ, সুকদেব রায় এর আগেও সামাজিক মাধ্যমে একাধিক উসকানিমূলক মন্তব্য করেছেন। এবারও তাঁর বক্তব্য উত্তরবঙ্গের সামাজিক পরিবেশকে উত্তপ্ত করতে পারে বলে দাবি বিজেপির।
বিজেপির পক্ষ থেকে প্রশাসনের কাছে দ্রুত পদক্ষেপের দাবি জানানো হয়েছে। একইসঙ্গে এই বক্তব্যের পিছনে কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
তবে এই ঘটনায় এখনও তৃণমূল নেতৃত্বের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া সামনে আসেনি। সুকদেব রায়ও সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেননি।
ফলে তাঁর বক্তব্যের পূর্ণ প্রেক্ষাপট কী ছিল, সেটি এখনও স্পষ্ট নয়। ভাইরাল হওয়া ভিডিওর সম্পূর্ণ বক্তব্য এবং তার প্রেক্ষাপট পুলিশ তদন্তে খতিয়ে দেখছে।
এই পরিস্থিতিতে ধূপগুড়িতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিকে নজর রয়েছে। কারণ উত্তরবঙ্গের রাজনীতি এমনিতেই ভাষা, পরিচয় এবং পৃথক রাজ্যের দাবি ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে উত্তপ্ত।
তার মধ্যে কোনও রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে বাঙালিদের এলাকা ছাড়ার হুঁশিয়ারির অভিযোগ নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এখন প্রশ্ন, পুলিশের তদন্তে কী উঠে আসে। অভিযোগের ভিত্তিতে যে মামলা হয়েছে, সেখানে কী কী ধারা যুক্ত করা হয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি ভিডিওটির সত্যতা, সম্পূর্ণ বক্তব্য এবং মন্তব্যের উদ্দেশ্যও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
সব মিলিয়ে স্বাধীনতা দিবসের ঠিক আগে ধূপগুড়ির এই ঘটনা উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ নেয় কি না, সেদিকেই এখন নজর।