Air India Pilot
এয়ার ইন্ডিয়ার ফুকেট-দিল্লি বিমানের ঘটনায় তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ৪ অগাস্ট মাঝ আকাশে আচমকা প্রায় ৩০০ ফুট নীচে নেমে গিয়েছিল বিমানটি। ঘটনায় অন্তত ২৪ জন যাত্রী ও ক্রু আহত হন। এবার জানা গেল, বিমানের পাইলটের ড্রাগ টেস্টে দু’বার মারিজুয়ানার উপস্থিতি ধরা পড়েছে। পাশাপাশি তিনি ঘুমের সমস্যার জন্য প্রেসক্রাইবড ওষুধও খাচ্ছিলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
ফুকেট থেকে দিল্লিগামী Air India-এর AI-2379 বিমানটিতে ছিলেন ১৩৭ জন যাত্রী এবং আটজন ক্রু সদস্য। Airbus A320neo বিমানটি ৪ অগাস্ট ওড়ার পর আচমকাই উচ্চতা হারায়। ঘটনাটি ওড়িশার আকাশসীমার উপর ঘটে। পরে বিমানটি নিরাপদে দিল্লিতে অবতরণ করে।
তবে আচমকা উচ্চতা কমে যাওয়ার ঘটনায় যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ায়। অন্তত ২০ জন যাত্রী এবং চারজন ক্রু সদস্য আহত হন। বিষয়টি এখন গুরুতর বিমান নিরাপত্তা তদন্তের আওতায় রয়েছে।
সংবাদ মাধ্যামের হাতে আসা এয়ার ইন্ডিয়ার অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট সেফটি রিপোর্টে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, বিমানের কমান্ডার পাইলটের ড্রাগ টেস্টে দু’বার মারিজুয়ানার উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছে।
প্রথম পরীক্ষার ফল আসার পর নমুনা আরও নিশ্চিত পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। পরবর্তী পরীক্ষাতেও মারিজুয়ানার উপস্থিতি ধরা পড়ে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে DGCA জানিয়েছিল, দুই পাইলটেরই বাধ্যতামূলক সাইকোঅ্যাক্টিভ সাবস্ট্যান্স স্ক্রিনিং করা হয়েছিল। প্রাথমিক পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে আরও পরীক্ষার প্রয়োজন হয়। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত দুই পাইলটকেই ডিউটি থেকে সরিয়ে রাখা হয়েছে।
তবে ড্রাগ টেস্টে মারিজুয়ানা ধরা পড়েছে বলেই সেটি ঠিক কখন গ্রহণ করা হয়েছিল, তা থেকে সরাসরি বলা যায় না যে উড়ানের সময় পাইলট নেশাগ্রস্ত ছিলেন। তদন্তকারীদের জন্য সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
ফ্লাইট সেফটি রিপোর্টে পাইলট নিজেই জানিয়েছেন, বেশ কিছুদিন ধরে তাঁর ঘুমের সমস্যা হচ্ছিল। ব্যক্তিগত পরিস্থিতির কারণে সেই সমস্যা তৈরি হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেছেন।
ঘুমের সমস্যার জন্য তিনি নিজের পারিবারিক চিকিৎসকের কাছ থেকে ওষুধ নিয়েছিলেন। ফুকেটে লে-ওভারের সময়ও ঘুম সহজে আসছিল না বলে তদন্তকারীদের জানিয়েছেন তিনি।
পাইলটের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি বিশ্রাম নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ঘুম না আসায় হাঁটাহাঁটি করেছিলেন। তাঁর দাবি, ঘুমের মান উন্নত করার জন্যই তিনি হালকা শারীরিক কার্যকলাপ করেছিলেন।
তবে ডিউটি রোস্টার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, রোস্টার আইনসিদ্ধ বিশ্রামের সময়সীমার মধ্যে থাকলেও দিনের বেলায় বিশ্রামের সময় অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত ছিল না।
প্রথম ফ্লাইটের জন্য তাঁকে রাত ১২টা ১০ মিনিটে রিপোর্ট করতে হয়েছিল। ফলে রাত ১০টার আগেই প্রস্তুতি শুরু করতে হত। ফুকেটে পৌঁছনোর পর বিমানবন্দর থেকে হোটেলে যেতে আরও দেড় থেকে দুই ঘণ্টা সময় লাগত।
ফলে পর্যাপ্ত ঘুমের সুযোগ কমে যাচ্ছিল বলে তাঁর বক্তব্য। দ্বিতীয় ফ্লাইটের আগে ভারতীয় সময় ভোর ৩টেয় তাঁকে উঠতে হয়েছিল।
ফ্লাইট সেফটি রিপোর্ট অনুযায়ী, বিমানটি আচমকা ৩০০ ফুট উচ্চতা হারানোর সময় কমান্ডার পাইলট নিজের আসনে ছিলেন না। সেই সময় কো-পাইলট বিমানটির নিয়ন্ত্রণে ছিলেন বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিমানের উচ্চতা কমে যাওয়ার পর পাইলট কেবিনে গিয়ে আহত যাত্রীদের খোঁজ নেন বলে জানা গিয়েছে। সূত্রের দাবি, যাত্রীদের তিনি তাঁকে বা বিমানটির ছবি তুলতে নিষেধ করেছিলেন।
দিল্লিতে অবতরণের পর পাইলটের হাঁটাচলায় অস্বাভাবিকতা ছিল বলেও সূত্রের দাবি। এমনকি ড্রাগ টেস্টের জন্য নমুনা দেওয়ার সময় তাঁকে সাহায্য করতে হয়েছিল বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফুকেটে থাকার সময়ও পাইলটের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, ফেরার ফ্লাইটের আগে তিনি ক্রু সদস্যদের একটি পার্টিতে নিয়ে গিয়েছিলেন।
এখন পুরো ঘটনাটিই তদন্তাধীন। পাইলটের ড্রাগ টেস্ট, তাঁর নেওয়া ওষুধ, বিশ্রামের সময়, রোস্টার এবং বিমানের আচমকা উচ্চতা হারানোর মধ্যে কোনও যোগসূত্র ছিল কি না, সেটাই তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে পাইলটের আচরণই বিমানের ৩০০ ফুট উচ্চতা হারানোর সরাসরি কারণ ছিল বলে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। বিমানটির প্রযুক্তিগত দিকও তদন্ত করা হচ্ছে।
এই ঘটনায় বিমান নিরাপত্তা এবং পাইলটদের ফিটনেস সংক্রান্ত নিয়ম নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ওষুধ সেবন, ঘুমের সমস্যা এবং সাইকোঅ্যাক্টিভ সাবস্ট্যান্স পরীক্ষার ক্ষেত্রে নিয়ম আরও কঠোরভাবে মানা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও নজর রয়েছে।
এখন তদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্টের দিকেই নজর। সেই রিপোর্টেই স্পষ্ট হতে পারে, ৪ অগাস্টের সেই ভয়াবহ মুহূর্তের আসল কারণ কী ছিল।