Raul Jimenez
ক্লাউড টিভি ডেস্ক: বিশ্বকাপের মঞ্চে বহু নাটকীয় গল্পের জন্ম হয়। তবে রাউল হিমেনেসের (Raul Jimenez) গল্প যেন সবকিছুকেই ছাপিয়ে যায়। একসময় মাঠেই মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেছিলেন তিনি। চিকিৎসকদের অক্লান্ত প্রচেষ্টা এবং নিজের অদম্য মানসিক শক্তিতে ফিরে এসেছিলেন ফুটবলে। আর এবার বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে গোল করে মেক্সিকোকে এনে দিলেন ঐতিহাসিক জয়।
দক্ষিণ আফ্রিকাকে ২-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করেছে মেক্সিকো। আর সেই জয়ের অন্যতম নায়ক রাউল হিমেনেস। প্রথমার্ধে হুলিয়ান কিনোনেস দলকে এগিয়ে দেওয়ার পর দ্বিতীয়ার্ধে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন অভিজ্ঞ এই স্ট্রাইকার।
এই গোলের গুরুত্ব শুধুমাত্র স্কোরলাইনে সীমাবদ্ধ নয়। মেক্সিকোর বিশ্বকাপ ইতিহাসেও এটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, অষ্টম প্রচেষ্টায় প্রথমবারের মতো কোনো বিশ্বকাপ আসরের উদ্বোধনী ম্যাচে জয় পেল মেক্সিকো।
২০২০ সালের নভেম্বর মাস। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে আর্সেনালের বিপক্ষে ম্যাচে ভয়াবহ এক দুর্ঘটনার শিকার হন হিমেনেস। প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডার ডেভিড লুইজের সঙ্গে সংঘর্ষে তাঁর মাথার খুলিতে চিড় ধরে।
ঘটনার ভয়াবহতা এতটাই ছিল যে মাঠেই অক্সিজেন দিতে হয়েছিল তাঁকে। কয়েক মুহূর্তের জন্য জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে পৌঁছে গিয়েছিলেন মেক্সিকান এই ফরোয়ার্ড। চিকিৎসক, সতীর্থ এবং পরিবারের সদস্যরা তখন কেবল প্রার্থনা করছিলেন— তিনি যেন বেঁচে থাকেন।
সেই সময় অনেকেই মনে করেছিলেন, হয়তো আর কখনও পেশাদার ফুটবলে ফিরতে পারবেন না হিমেনেস। কিন্তু তিনি হার মানেননি। দীর্ঘ পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শেষে ধীরে ধীরে মাঠে ফিরেছেন এবং আবারও নিজেকে প্রমাণ করেছেন।
দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে রবের্তো আলভারাদোর নিখুঁত ক্রস থেকে হেডে বল জালে জড়িয়ে দেন হিমেনেস। গোল করার পর তাঁর উচ্ছ্বাস ছিল দেখার মতো।
গোল উদযাপনের একপর্যায়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ইঙ্গিত করতে দেখা যায় তাঁকে। অনেকের মতে, চলতি বছরের মার্চ মাসে প্রয়াত হওয়া তাঁর বাবা রাউল হিমেনেস ভেগার প্রতিই শ্রদ্ধা নিবেদন করছিলেন তিনি।
স্টেডিয়ামে উপস্থিত প্রায় ৮০ হাজার দর্শকের অধিকাংশই ছিলেন মেক্সিকান সমর্থক। হিমেনেসের গোলের পর গর্জে ওঠে গোটা গ্যালারি। সতীর্থরাও ছুটে এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরেন। আবেগে ভেসে ওঠে তাঁর চোখ।
বিশ্বকাপের এই ম্যাচটি হিমেনেসের ক্যারিয়ারে আরেকটি বিশেষ অধ্যায় যোগ করেছে। ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২২ বিশ্বকাপে মেক্সিকোর হয়ে খেললেও এর আগে কখনও শুরুর একাদশে সুযোগ পাননি তিনি।
২০১৪ সালে একটি, ২০১৮ সালে দুটি এবং ২০২২ সালে তিনটি ম্যাচ খেলেছিলেন বদলি হিসেবে। অবশেষে এবার প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে শুরুর একাদশে নেমেই গোল করে দলকে জয় উপহার দিলেন।
মেক্সিকোর জার্সিতে এটি ছিল তাঁর ১২৫তম ম্যাচ। দেশের হয়ে তাঁর গোলসংখ্যা দাঁড়াল ৪৬-এ। মেক্সিকোর ইতিহাসে তাঁর চেয়ে বেশি গোল করেছেন কেবল হাভিয়ের ‘চিচারিতো’ এর্নান্দেস, যার গোল সংখ্যা ৫২।
মেক্সিকোর ক্লাব আমেরিকায় ক্যারিয়ার শুরু করে ইউরোপে পাড়ি জমান হিমেনেস। খেলেছেন আতলেতিকো মাদ্রিদ ও বেনফিকার মতো ক্লাবে। পরে উলভারহ্যাম্পটন ওয়ান্ডারার্সে যোগ দিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন প্রিমিয়ার লিগের অন্যতম নির্ভরযোগ্য স্ট্রাইকার হিসেবে।
২০১৮-১৯ মৌসুমে ১৩ গোল করে উলভসের ইতিহাসে অন্যতম সফল সাইনিংয়ে পরিণত হন। পরের মৌসুমে করেন ১৭ গোল।
মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে বিশ্বকাপের মঞ্চে গোল করে দলকে জয় এনে দেওয়া— রাউল হিমেনেসের গল্প যেন ফুটবলের এক অনুপ্রেরণামূলক রূপকথা।