Mohammed Afroz 9/11
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকায় আল-কায়েদার ভয়াবহ হামলা গোটা বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল। চারটি বিমান ছিনতাই করে হামলা চালানো হয় নিউ ইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার, পেন্টাগন এবং পেনসিলভেনিয়ার একটি এলাকায়। ১৯ জন আল-কায়েদা অপারেটিভ এই হামলায় যুক্ত ছিল।
কিন্তু হামলার প্রায় এক মাস পর মুম্বই পুলিশের হাতে ধরা পড়া এক যুবকের দাবি আরও চাঞ্চল্য তৈরি করেছিল। তাঁর নাম ছিল মোহাম্মদ আফরোজ। পুলিশের জেরায় আফরোজ দাবি করেছিলেন, আমেরিকার পাশাপাশি ব্রিটেন ও অস্ট্রেলিয়াতেও ১১ সেপ্টেম্বর হামলার পরিকল্পনা ছিল এবং তিনিও সেই বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ ছিলেন। পরে অবশ্য আন্তর্জাতিক তদন্তে তাঁর দাবির সমর্থনে প্রমাণ মেলেনি।
মুম্বইয়ের চিতা ক্যাম্পের বাসিন্দা ছিলেন আফরোজ। তাঁর বাবা সেখানে টেলরের কাজ করতেন। ২০০১ সালের অক্টোবরে মুম্বই পুলিশ খবর পায়, আফরোজ বিদেশে গিয়ে পাইলটের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।
এই তথ্যই তদন্তকারীদের সন্দেহ বাড়িয়ে দেয়। চিতা ক্যাম্পের মতো আর্থিকভাবে অনগ্রসর এলাকা থেকে আসা একজন যুবক কীভাবে বিদেশে গিয়ে ব্যয়বহুল পাইলট প্রশিক্ষণের খরচ বহন করলেন—এই প্রশ্ন ওঠে পুলিশের মনে। তদন্তকারীরা সন্দেহ করেন, কোনও ব্যক্তি বা সংগঠন হয়তো তাঁর প্রশিক্ষণের জন্য অর্থ জুগিয়েছিল।
পুলিশ জানতে পারে, আফরোজ ভারতে ফিরে এসেছেন। পরে নবি মুম্বইয়ের ভাশি এলাকার হোটেল অ্যাবটে তাঁর সন্ধান মেলে। সেখানে অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়।
মুম্বই পুলিশের দাবি, জেরার সময় আফরোজ জানিয়েছিলেন যে তিনি 9/11-এর বৃহত্তর আল-কায়েদা ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
পুলিশের কাছে তাঁর কথিত বয়ান অনুযায়ী, তাঁকে এমন একটি দলের সদস্য করা হয়েছিল, যার লক্ষ্য ছিল একটি বিমান ছিনতাই করে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে আছড়ে ফেলা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১১ সেপ্টেম্বর ২০০১ লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দর থেকে ম্যানচেস্টারগামী একটি বিমান ছিনতাই করার কথা ছিল।
তবে আমেরিকায় হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্বের বিমানবন্দরগুলিতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। ফলে ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি বলে পুলিশের কাছে দাবি করেছিলেন আফরোজ।
আফরোজ আরও দাবি করেছিলেন, অস্ট্রেলিয়ায় তাঁকে সন্ত্রাসবাদের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল এবং তিনি তিনটি দেশে পাইলট প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন—অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন ও আমেরিকায়।
পুলিশের কাছে তাঁর কথিত বক্তব্য অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের রিয়াল্টো টাওয়ারে হামলার জন্যও একটি পৃথক দল তৈরি করা হয়েছিল।
তাঁর দাবি কতটা সত্য, তা যাচাই করতে মুম্বই পুলিশ আমেরিকা, ব্রিটেন এবং অস্ট্রেলিয়ায় তদন্তকারী দল পাঠায়। তৎকালীন মুম্বই পুলিশ কমিশনার এম এন সিংহও তদন্তের অংশ হিসেবে ব্রিটেনে গিয়েছিলেন।
আফরোজের বক্তব্য ছিল অত্যন্ত গুরুতর। তাই শুধু মুম্বইতেই নয়, বিদেশেও তদন্ত চালানো হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর দাবিগুলির সমর্থনে কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
মুম্বই পুলিশও আদালতে আফরোজের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করার মতো যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করতে পারেনি। পরে তাঁর বিরুদ্ধে Prevention of Terrorism Act বা POTA-র ধারাগুলি সরিয়ে নেওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয় এবং তিনি মুক্তি পান।
জেল থেকে বেরিয়ে আফরোজ নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাঁর দাবি ছিল, তাঁকে পুলিশ মিথ্যাভাবে ফাঁসিয়েছিল এবং তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলি ভিত্তিহীন।
পরে তিনি অণুশক্তিনগর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে নির্বাচনে লড়েছিলেন, যদিও জয় পাননি।
9/11-এর ২৫ বছর পূর্তিতে যখন সেই হামলার ইতিহাস নতুন করে ফিরে দেখা হচ্ছে, তখন মোহাম্মদ আফরোজের এই ঘটনা ফের আলোচনায় এসেছে।
তবে ঘটনাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল—আফরোজের দাবি ছিল চাঞ্চল্যকর, কিন্তু আমেরিকা, ব্রিটেন ও অস্ট্রেলিয়ায় তদন্তের পরও সেই দাবির পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই ব্রিটেন বা অস্ট্রেলিয়ায় 9/11-এর দিন তাঁর কথিত হামলার পরিকল্পনাকে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে দেখার আগে এই তদন্তের ফল এবং তাঁর পরবর্তী অস্বীকার—দুই দিকই বিবেচনায় রাখা জরুরি।