West Bengal investment
পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতিকে নতুন করে গতি দিতে শুধু বড় অঙ্কের বিনিয়োগ নয়, প্রয়োজন এমন একটি ‘আইকনিক ইনভেস্টমেন্ট’, যা রাজ্যের অর্থনীতির ভাবমূর্তিকেও বদলে দিতে পারে। কলকাতায় আয়োজিত বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও উদ্যোগ বিষয়ক এক আলোচনাসভায় এমনই মত প্রকাশ করলেন পশ্চিমবঙ্গের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত।
১০ সেপ্টেম্বর কলকাতায় Chintan Research Foundation (CRF) এবং Indian Institute of Foreign Trade (IIFT)-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই থিম্যাটিক সেমিনারে রাজ্যের বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে খোলামেলা মূল্যায়ন করেন তিনি। অতীতের সমস্যা স্বীকার করার পাশাপাশি আগামী দিনে আরও কার্যকর এবং উৎপাদনশীল বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করার উপর জোর দেন অর্থমন্ত্রী।
স্বপন দাশগুপ্ত পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থাকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দেখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তাঁর বক্তব্য, ১৯৬০-এর দশক এবং ১৯৭০-এর দশকের গোড়া পর্যন্ত ভারতের অর্থনৈতিক বিকাশের অন্যতম অগ্রণী কেন্দ্র ছিল পশ্চিমবঙ্গ।
এরপর দীর্ঘ সময় ধরে রাজ্যের অর্থনীতিতে অবনমন দেখা যায়। তাঁর মতে, সেই অতীতের প্রভাব এখনও বিনিয়োগকারীদের মানসিকতায় রয়েছে এবং রাজ্যের সামনে এখন অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হল সেই আস্থার জায়গাটি পুনর্গঠন করা।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসে ‘credibility gap’-এর প্রসঙ্গ। অতীতে বিনিয়োগের জন্য বিভিন্ন ধরনের সুবিধা বা প্রণোদনার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর তা প্রত্যাহারের মতো ঘটনা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে তিনি মনে করেন।
তাই নতুন বিনিয়োগ টানার আগে সরকারের প্রতিশ্রুতির প্রতি বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করাই গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কার্যকর করার ক্ষেত্রে দৃঢ় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছা দেখাতে হবে বলেও তিনি জোর দেন।
রাজ্যের বিনিয়োগ পরিবেশের আরেকটি সমস্যা হিসেবে তিনি তুলে ধরেন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ঝুঁকি নেওয়ার অনীহা। তাঁর মতে, এর প্রভাব শুধু সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে নয়, প্রশাসনের কিছু অংশের কাজের পদ্ধতিতেও দেখা যায়।
মহারাষ্ট্র ও গুজরাতের মতো রাজ্যে তুলনামূলক নমনীয় প্রশাসনিক পদ্ধতি দেখা যায় বলে উল্লেখ করে তিনি পশ্চিমবঙ্গেও আরও কার্যকর ও ব্যবসাবান্ধব প্রশাসনিক পরিবেশের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
পশ্চিমবঙ্গের রফতানি প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রেও বেশ কিছু ঘাটতি রয়েছে বলে মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী। জটিল নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা এবং উচ্চমূল্যের উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় ডিজাইন ও উদ্ভাবনী সক্ষমতার ধীর বিকাশকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন তিনি।
শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে গেলে পণ্যের মান, ডিজাইন, প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনের উপরও জোর দিতে হবে বলে তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত মেলে।
শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রেও পশ্চিমবঙ্গকে আরও এগোতে হবে বলে মনে করেন স্বপন দাশগুপ্ত। তাঁর মতে, তামিলনাড়ু ও মহারাষ্ট্রের মতো রাজ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং উন্নত প্রযুক্তিগত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে।
এর বিপরীতে পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষিত বহু প্রতিভা ভালো সুযোগের সন্ধানে অন্য রাজ্য বা দেশের বাইরে চলে যায়। তবে বাঙালি ডায়াস্পোরা যে বিশ্ব প্রযুক্তি শিল্পে নেতৃত্বের জায়গায় রয়েছে, সেটিকেই রাজ্যের জন্য বড় সম্পদ হিসেবে দেখছেন তিনি।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে জমির প্রশ্নটিকেও গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা হিসেবে উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী। তবে তাঁর মতে, সমস্যাটি সবসময় জমির অভাব নয়।
বরং জমি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে আইনি এবং প্রশাসনিক জটিলতাই অনেক সময় বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এই প্রক্রিয়াগুলি সরল করা গেলে শিল্প ও বিনিয়োগের জন্য জমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরও গতি আসতে পারে।
আগামী দিনের জন্য তিনটি বড় বিনিয়োগ উৎসের সম্ভাবনার কথা বলেন স্বপন দাশগুপ্ত। প্রথমত, যে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলের সম্পর্ক রয়েছে। দ্বিতীয়ত, রাজ্যে ইতিমধ্যেই থাকা শিল্প সংস্থাগুলি। তৃতীয়ত, অতীতে রাজ্য ছেড়ে যাওয়া বাঙালি ডায়াস্পোরার সদস্যরা, যাঁদের একাংশ এখন নতুনভাবে রাজ্যে ফিরে আসতে পারেন।
তাঁর মতে, প্রত্যাবর্তন যদি হয়ও, তা যেন পরিকল্পিত, ছোট পরিসরে এবং দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের ভিত্তিতে হয়।
দীর্ঘমেয়াদি এবং সম্পর্কনির্ভর বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ভারতে জাপানি সংস্থাগুলির মডেলের কথা উল্লেখ করেন তিনি। বিনিয়োগকে শুধুমাত্র দ্রুত মুনাফার দৃষ্টিতে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব হিসেবে দেখার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেন অর্থমন্ত্রী।
একই সঙ্গে ভারতের সফটওয়্যার শিল্পের প্রাথমিক বিকাশের কথাও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, অতীতে কঠোর নীতিকাঠামোর অনুপস্থিতি কখনও কখনও শিল্পকে স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দিয়েছে। অর্থাৎ, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে নমনীয়তাও বৃদ্ধির সহায়ক হতে পারে।
নতুন বিনিয়োগ নীতি তৈরি হওয়ার সময় কিছুটা ধৈর্য ধরার জন্য সকলের কাছে আবেদন জানান অর্থমন্ত্রী। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন, সরকারের প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে বিশ্বাসযোগ্যতা দেখানো জরুরি।
তাঁর মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ভারতের সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশ আরও উৎপাদনশীল দিকে এগিয়েছে। সেই পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গও অতীতের নেতিবাচক ধারণা থেকে বেরিয়ে আরও কার্যকর বিনিয়োগ এবং শিল্প বৃদ্ধির পথে এগোতে পারে।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের আগে সেমিনারের উদ্বোধনী অধিবেশনে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও উদ্যোগের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান নিয়ে আলোচনা হয়। রাজ্যের বৃহত্তর উন্নয়ন-চিত্রের সঙ্গে শিল্প ও উদ্যোগ নীতির সম্পর্ক নিয়েও একটি fireside chat অনুষ্ঠিত হয়।
দিনের দুটি বিশেষ অধিবেশনে প্রথমে বন্দর, সড়ক, রেল ও লজিস্টিক্স পরিকাঠামো এবং সাম্প্রতিক বিনিয়োগ প্রবণতা নিয়ে আলোচনা হয়। লক্ষ্য ছিল ভৌগোলিক অবস্থানকে কীভাবে ধারাবাহিক মূলধন প্রবাহ ও শিল্প বৃদ্ধিতে রূপান্তর করা যায়, তা খতিয়ে দেখা।
দ্বিতীয় অধিবেশনে রাজ্যের informal economy এবং MSME sector নিয়ে আলোচনা হয়। ছোট ব্যবসাগুলিকে কীভাবে formal economy-র সঙ্গে যুক্ত করা যায়, ঋণের সুযোগ বাড়ানো যায় এবং বৃহত্তর বাণিজ্য ও বিনিয়োগ প্রবাহের সঙ্গে তাদের সংযোগ শক্তিশালী করা যায়, তা নিয়ে মতবিনিময় হয়।
সেমিনারের আলোচনার ভিত্তিতে লজিস্টিক্স, বিনিয়োগ সহজীকরণ এবং MSME সহায়তা নিয়ে নির্দিষ্ট সুপারিশ-সম্বলিত একটি policy paper প্রকাশের সম্ভাবনা রয়েছে।