Lionel Messi
একটা কাপ। তারপর বাবাকে হারানোর শোক। লিওনেল মেসির জীবনে নেমে এসেছে কঠিন সময়। বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে হেরেছিল আর্জেন্টিনা। তারপর ক্লাব ফুটবলে ফিরেছিলেন মেসি। মাঠে নেমে গোলও করেছিলেন। এরপরই এল বাবার মৃত্যুসংবাদ। হর্হে মেসি ছিলেন শুধু লিওনেলের বাবা নন। ছিলেন তাঁর দীর্ঘদিনের প্রতিনিধি এবং পরামর্শদাতাও। ছেলের ফুটবলজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের একজন ছিলেন তিনি।
হর্হে মেসির বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর রোজারিওর একটি ক্লিনিকে তাঁর মৃত্যু হয়। বাবার মৃত্যুর পর দ্রুত আমেরিকা থেকে আর্জেন্টিনায় ফিরে যান মেসি। রোজারিওর কাছে পেরেজের El Prado কবরস্থানে হয় শেষকৃত্য। ৯ অগস্ট অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে সেই অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্যদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন মেসিও।
এবার সামনে এল আরও বড় সিদ্ধান্ত।
আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, বাবার মৃত্যুর পর আপাতত ফুটবল থেকে বিরতি নিয়েছেন মেসি।
Inter Miami তাঁকে অনির্দিষ্টকালের ছুটি দিয়েছে বলে ওই রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে।
অর্থাৎ কবে তিনি আবার ক্লাবের হয়ে খেলবেন, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। সাম্প্রতিক রিপোর্টগুলিও বলছে, মেসির ফেরার কোনও নির্দিষ্ট তারিখ নেই। এই মুহূর্তে তিনি পরিবারের সঙ্গেই থাকতে চাইছেন।
ফলে Inter Miami-র পরবর্তী ম্যাচগুলিতে তাঁকে দেখা যাবে কি না, সেটিও অনিশ্চিত।
বিশেষ করে Leagues Cup-এর ম্যাচ ঘিরে মেসিকে নিয়ে আগ্রহ ছিল। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর তিনি সেই ম্যাচ থেকে দূরে ছিলেন। এখন প্রশ্ন একটাই। কবে আবার মাঠে ফিরবেন মেসি?
তার উত্তর আপাতত কারও কাছে নেই। কারণ এই মুহূর্তে ফুটবল নয়। পরিবারই মেসির কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
লিওনেল মেসির জীবনে হর্হে মেসির ভূমিকা ছিল অসাধারণ। শুধু একজন বাবা হিসেবে নয়। তিনি ছিলেন ছেলের প্রথম দিকের ফুটবলজীবনের অন্যতম প্রধান অভিভাবক।
মাত্র ১৩ বছর বয়সে লিওনেলকে নিয়ে বার্সেলোনায় চলে গিয়েছিলেন হর্হে।
সেই সময় মেসির বয়স ছিল মাত্র ১৩। সেখান থেকেই শুরু হয় এক ঐতিহাসিক ফুটবলযাত্রা। পরে হর্হে মেসি ছেলের প্রতিনিধি হিসেবেও কাজ করেন। বার্সেলোনা থেকে পরবর্তী ক্লাবজীবন পর্যন্ত তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
মেসি নিজেও বহুবার বাবার গুরুত্বের কথা বলেছেন। একবার তিনি জানিয়েছিলেন, ছোটবেলায় প্রতিটি ম্যাচের পর বাবার অনুমোদন চাইতেন। বাবা কীভাবে তাঁর খেলা দেখেছেন, সেটি মেসির কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই সম্পর্কের গভীরতা বোঝা যায় সাম্প্রতিক বিশ্বকাপের ঘটনাতেও।
আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেছিলেন মেসি। প্রথম গোলের পর আবেগে কেঁদে ফেলেছিলেন তিনি। সেই সময় মেসি জানিয়েছিলেন, তাঁর চোখের জলের কারণ ফুটবল নয়। তিনি ব্যক্তিগত কিছু কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। এর কিছুদিন পর পরিবার হর্হে মেসির অসুস্থতার কথা প্রকাশ্যে জানিয়েছিল।
ফলে বিশ্বকাপের সময়ও বাবার শারীরিক অবস্থার চিন্তা মেসির সঙ্গে ছিল।
মেসির পেশাদার জীবনে অসংখ্য চাপ এসেছে। বিশ্বকাপের ফাইনালে হার। কোপা আমেরিকার ব্যর্থতা। বার্সেলোনা ছাড়ার আবেগ। জাতীয় দলের হয়ে দীর্ঘ অপেক্ষা।
সবকিছু সামলে তিনি আবার মাঠে ফিরেছেন। কিন্তু বাবাকে হারানোর মতো ব্যক্তিগত শোক অন্যরকম। কারণ হর্হে মেসি ছিলেন তাঁর জীবনের প্রায় প্রতিটি বড় বাঁকের সঙ্গী।
ছোট্ট রোজারিও থেকে বার্সেলোনা। বার্সেলোনা থেকে বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষে ওঠা। তারপর আর্জেন্টিনার অধিনায়ক হিসেবে বিশ্বজয়। এই দীর্ঘ যাত্রায় বাবার উপস্থিতি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। হর্হে শুধু ছেলের এজেন্ট ছিলেন না। ছিলেন তাঁর পরামর্শদাতা এবং ঘনিষ্ঠ মানুষ।
সেই মানুষটিকেই এবার হারালেন মেসি। শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানও তাই রাখা হয়েছিল অত্যন্ত ব্যক্তিগত। পরিবারের ঘনিষ্ঠ মানুষ ছাড়া কাউকে সেখানে থাকতে দেওয়া হয়নি। নিরাপত্তার ব্যবস্থাও ছিল কড়া।
তবু মেসির জন্য সমর্থন জানাতে রোজারিওতে হাজির হয়েছিলেন বহু সমর্থক।
কবরস্থানের বাইরে লেখা ছিল—‘Fuerza Leo’। অর্থাৎ, ‘শক্ত থাকো লিও’।
আর্জেন্টিনার ফুটবল মহলও পাশে দাঁড়িয়েছে মেসির পরিবারের।
আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন ডিভিশনের ম্যাচে হর্হে মেসির স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হবে। খেলোয়াড়, কোচ এবং রেফারিরাও কালো আর্মব্যান্ড পরবেন।
বার্সেলোনাও হর্হে মেসির মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে। ক্লাবটি লিওনেলের ফুটবলজীবনের শুরুতে হর্হের ভূমিকার কথা স্মরণ করেছে। এখন মেসির সামনে তাই শুধু বিশ্রামের সময়।
ফুটবলে তাঁর প্রত্যাবর্তন কবে হবে, তা সময়ই বলবে।
৩৯ বছরের মেসি এখনও Inter Miami এবং আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তারকা। তাঁর প্রত্যাবর্তনের জন্য অপেক্ষা করবে গোটা ফুটবলবিশ্ব। কিন্তু তার আগে মেসির প্রয়োজন পরিবারকে সময় দেওয়া। বাবাকে হারানোর এই শোক থেকে বেরিয়ে আসতে যতটা সময় দরকার, সেটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মাঠে গোলের জন্য অপেক্ষা করতে পারে ফুটবল।
কিন্তু বাবাকে হারানোর পর ছেলের যে শোক, তার কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা হয় না।