• ২ কার্তিক ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ১৯ অক্টোবর ২০২৬
Salah Shehadeh killing

সালাহ শেহাদেহকে খতমের মিশন: কীভাবে অপারেশনেই প্রাণ গেল শিশুকন্যা ইমানের

২০০২ সালের জুলাইয়ে হামাস কমান্ডার সালাহ শেহাদেহকে হত্যার জন্য গাজায় চালানো হয় বিমান হামলা। শেহাদেহ নিহত হলেও হামলায় প্রাণ যায় তাঁর স্ত্রী, সহকারী এবং একাধিক সাধারণ মানুষের। নিহতদের মধ্যে ছিল তাঁর ১৫ বছরের মেয়ে ইমানও। এই অভিযান পরবর্তী সময়ে গোয়েন্দা তথ্য ও বেসামরিক নিরাপত্তা নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি করে।

সালাহ শেহাদেহকে খতমের মিশন: কীভাবে অপারেশনেই প্রাণ গেল শিশুকন্যা ইমানের

Salah Shehadeh killing

Published by: cloud_admin
  • Posted:September 24, 2026 12:02 pm
  • Update:September 24, 2026 12:24 pm
  • Facebook
  • Telegram
  • X
  • Whatsapp

ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা Shin Bet-এর কাছে সালাহ শেহাদেহ ছিলেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ টার্গেট। ইসরায়েলি নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের অভিযোগ ছিল, হামাসের সামরিক শাখার এই কমান্ডার একাধিক হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁকে খুঁজে বের করতে দীর্ঘদিন ধরে গোয়েন্দা অভিযান চলছিল। শেষ পর্যন্ত ২০০২ সালের জুলাইয়ে গাজা শহরের একটি আবাসিক এলাকায় তাঁকে শনাক্ত করা হয়।

এরপর শুরু হয় তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা। কিন্তু সেই পরিকল্পনার মধ্যেই সামনে আসে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন—টার্গেটকে আঘাত করতে গিয়ে আশপাশের নিরপরাধ মানুষকে কীভাবে বাঁচানো যাবে?

৪৭৪ মৃত্যু ও ২,৬৪৯ আহতের অভিযোগ

সালাহ শেহাদেহ হামাসের সামরিক শাখার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডার ছিলেন। ইসরায়েলি গোয়েন্দা নথি অনুযায়ী, ২০০১ সালের জুলাই থেকে ২০০২ সালের জুলাইয়ের মধ্যে ইসরায়েলে হওয়া হামলাগুলির সঙ্গে তাঁর সরাসরি যোগ ছিল বলে অভিযোগ করা হয়। ওই হামলাগুলিতে ৪৭৪ জন নিহত এবং ২,৬৪৯ জন আহত হয়েছিল বলে ইসরায়েলি গোয়েন্দা হিসাবের উল্লেখ পাওয়া যায়।

শেহাদেহ গাজা উপত্যকা থেকেই হামাসের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন বলে ইসরায়েলি নিরাপত্তা সংস্থাগুলির দাবি ছিল। তাঁকে ধরতে বা হত্যা করতে একাধিকবার পরিকল্পনা করা হয়।

কিন্তু প্রতিবারই একটি বিষয় বড় হয়ে দাঁড়ায়। শেহাদেহর আশপাশে তাঁর পরিবারের সদস্য বা অন্য বেসামরিক মানুষ থাকলে অভিযান পিছিয়ে দেওয়া হতো।

সাবেক Shin Bet প্রধান আভি ডিখটার পরে জানান, শেহাদেহর মেয়ের উপস্থিতি নিশ্চিত হলে আগের পরিকল্পনাগুলি অনুমোদন করা হয়নি। এই ঘটনাই দেখায়, বেসামরিক হতাহতের ঝুঁকি নিয়ে তখন গোয়েন্দা পর্যায়ে কতটা সতর্কতা ছিল বলে ইসরায়েলি পক্ষ দাবি করেছিল।

২২ জুলাই ২০০২: এক টন বোমা, কয়েক সেকেন্ডে ধ্বংস বাড়ি

২০০২ সালের ২২ জুলাই রাতে গাজা শহরের আল-দারাজ এলাকায় শেহাদেহর অবস্থান শনাক্ত করা হয়। একটি ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকায় তিনি ছিলেন।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী অ্যারিয়েল শ্যারন এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেনিয়ামিন বেন-এলিয়েজার অভিযানটির অনুমোদন দিয়েছিলেন বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। এরপর একটি F-16 যুদ্ধবিমান থেকে প্রায় এক টন ওজনের বোমা ফেলা হয়। লক্ষ্য ছিল শেহাদেহর বাড়ি।

বিস্ফোরণে তিনতলা ভবনটি ধ্বংস হয়ে যায়। শেহাদেহ এবং তাঁর এক সহকারী নিহত হন। তাঁর স্ত্রীও মারা যান।

কিন্তু এখানেই ঘটে যায় অপারেশনের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি।

বাড়ির আশপাশে থাকা বেসামরিক মানুষও বিস্ফোরণের শিকার হন। মানবাধিকার সংস্থা Human Rights Watch-এর তৎকালীন হিসাবে ১৩ জন বেসামরিক মানুষ নিহত এবং প্রায় ১৪০ জন আহত হয়েছিলেন। পরে বিভিন্ন তদন্ত ও নথিতে নিহত বেসামরিক মানুষের সংখ্যা ১৪ বা তারও বেশি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

Amnesty International-এর নথিতে আবার ১৭ জন নিহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। তাদের মধ্যে নয়জন শিশু ছিলেন। নিহত শিশুদের তালিকায় ছিল শেহাদেহর ১৫ বছর বয়সী মেয়ে ইমান সালাহ শেহাদেহ।

অর্থাৎ, গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী বাড়িতে শেহাদেহর মেয়ে নেই—এমন ধারণার ভিত্তিতেই অভিযান চালানো হয়েছিল বলে ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বক্তব্য ছিল। কিন্তু বাস্তবে ইমান সেখানে ছিলেন।

“টার্গেট নিহত, কিন্তু অপারেশন ব্যর্থ”—ইসরায়েলি তদন্তে প্রশ্ন

অভিযানের পর বেসামরিক প্রাণহানিকে ঘিরে তীব্র আন্তর্জাতিক সমালোচনা শুরু হয়। Human Rights Watch বলেছিল, এত ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এত শক্তিশালী বোমা ব্যবহার করে বেসামরিক প্রাণহানি এড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় সতর্কতা নেওয়া হয়নি। সংস্থাটি ঘটনাটিকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে বর্ণনা করেছিল।

পরবর্তী ইসরায়েলি তদন্তেও গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতি এবং বেসামরিক মানুষের উপস্থিতি সম্পর্কে ভুল মূল্যায়নের বিষয় উঠে আসে। তদন্তে বলা হয়, তথ্য সম্পূর্ণ ও নির্ভুল হলে আঘাতের সময় বা পদ্ধতি বদলে দেওয়া হতে পারত।

সাবেক Shin Bet প্রধান আভি ডিখটার পরে ঘটনাটিকে সংক্ষেপে এভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন—টার্গেটকে হত্যা করা সম্ভব হয়েছিল, কিন্তু পুরো অভিযান প্রত্যাশিতভাবে সফল হয়নি।

সালাহ শেহাদেহ ইসরায়েলের প্রধান টার্গেটদের একজন ছিলেন। তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল। কিন্তু সেই অভিযানের সঙ্গে জড়িয়ে যায় তাঁর স্ত্রী, সহকারী এবং একাধিক সাধারণ মানুষের মৃত্যু। তাঁদের মধ্যে ছিল শিশু ইমানও।

এই ঘটনা তাই শুধু একটি targeted killing-এর ইতিহাস নয়। এটি গোয়েন্দা তথ্য, সামরিক সিদ্ধান্ত এবং বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তার মধ্যে সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ২০০২ সালের সেই রাতের ঘটনা আজও ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের সবচেয়ে বিতর্কিত targeted killing অভিযানগুলির একটি হিসেবে আলোচিত হয়।

আরও খবর