US Pakistan minerals deal
বালোচিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ, US Strategic Metals-এর কাজ থমকে যাওয়ার দাবি; ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইসলামাবাদের খনিজ-দৌড়ে বড় প্রশ্ন নিরাপত্তা নিয়েই
চিনের পর এবার বালোচিস্তানে আমেরিকার খনিজ-স্বপ্নও ধাক্কা খেল? পাকিস্তানের সঙ্গে বিরল ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ নিয়ে গাঁটছড়া বেঁধে বালোচিস্তানে বিনিয়োগের যে পরিকল্পনা করেছিল মার্কিন সংস্থা US Strategic Metals (USSM), তা নিরাপত্তাজনিত কারণে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বলে একটি সাম্প্রতিক রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, করাচি ও ইসলামাবাদে USSM-এর কার্যক্রমও থমকে গিয়েছে। তবে এই নির্দিষ্ট কর্মসূচি বন্ধের বিষয়ে এখনও মার্কিন বা পাকিস্তান সরকারের কোনও বিস্তারিত আনুষ্ঠানিক ঘোষণা সামনে আসেনি।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের Frontier Works Organisation (FWO) এবং মিসৌরিভিত্তিক US Strategic Metals-এর মধ্যে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারের একটি সমঝোতা হয়। চুক্তির আওতায় অ্যান্টিমনি, তামা, টাংস্টেন এবং বিরল মাটির উপাদান বা rare earth elements-সহ গুরুত্বপূর্ণ খনিজের অনুসন্ধান, উত্তোলন, প্রক্রিয়াকরণ এবং ভবিষ্যতে পাকিস্তানে একটি পলিমেটালিক রিফাইনারি তৈরির পরিকল্পনা ছিল। পাকিস্তান সরকারের প্রকাশিত তথ্যেও এই সহযোগিতার কথা উল্লেখ রয়েছে।
পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের একটি বড় অংশ বালোচিস্তানে অবস্থিত। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই প্রদেশে বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহ এবং সশস্ত্র হামলা বিদেশি বিনিয়োগের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বালোচ লিবারেশন আর্মি বা BLA-সহ বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলি বিদেশি বিনিয়োগ, বিশেষ করে খনিজ ও পরিকাঠামো প্রকল্পকে নিশানা করে এসেছে।
সাম্প্রতিক রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, বালোচিস্তানের খনি অঞ্চলে হামলা এবং যাতায়াতের পথে বাধার কারণে USSM-এর কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে চাগাই জেলার খনি অঞ্চল এবং রেকো ডিকের মতো প্রকল্প ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
এই নিরাপত্তা-ঝুঁকির বিষয়টি অবশ্য নতুন নয়। চলতি বছরের এপ্রিলেই মার্কিন গবেষণা সংস্থা CSIS-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল, বালোচিস্তানে সন্ত্রাস ও বিদ্রোহী হামলা বিদেশি খনিজ বিনিয়োগের জন্য অন্যতম প্রধান ঝুঁকি। ওই রিপোর্টে বলা হয়, ২০২৫ সালে পাকিস্তানের সন্ত্রাসী হামলার অর্ধেকেরও বেশি বালোচিস্তানে ঘটেছিল, যদিও দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র প্রায় ৬ শতাংশ এই প্রদেশে বাস করে।
পাকিস্তান ও আমেরিকার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ নিয়ে নতুন সম্পর্ক তৈরির পেছনে ছিল ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের চীনের ওপর নির্ভরতা কমানোর কৌশল। ২০২৫ সালে পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান আসিম মুনির ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেই সময় পাকিস্তানের খনিজ সম্পদের নমুনাও মার্কিন প্রেসিডেন্টকে দেখানো হয়েছিল বলে একাধিক রিপোর্টে উঠে আসে।
এরপরই US Strategic Metals এবং পাকিস্তানের FWO-র মধ্যে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি সামনে আসে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে পাকিস্তান ইতিমধ্যেই অ্যান্টিমনি, কপার কনসেনট্রেট এবং নিওডিমিয়াম ও প্রাসিওডিমিয়াম-সহ rare earth elements-এর একটি প্রথম চালান USSM-এর কাছে পাঠিয়েছিল বলে সংস্থাটির নিজস্ব ঘোষণায় জানানো হয়।
অর্থাৎ, বর্তমান সংকটকে পাকিস্তান থেকে আমেরিকায় “প্রথম চালান পাঠানো বন্ধ” হিসেবে দেখার বদলে বরং পরবর্তী পর্যায়ের সরবরাহ ও প্রকল্প বাস্তবায়নে বাধা হিসেবে দেখা বেশি সঠিক।
বালোচিস্তান শুধু পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়। আরব সাগরের উপকূল, গওয়াদর বন্দর, ইরান ও আফগানিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত এবং চীনের Belt and Road প্রকল্পের উপস্থিতির কারণে অঞ্চলটি গোটা দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ।
চিন ইতিমধ্যেই বালোচিস্তানে CPEC-এর মাধ্যমে বড় পরিকাঠামো বিনিয়োগ করেছে। একই সঙ্গে চিনা নাগরিক ও প্রকল্পের উপর একাধিক হামলা বেইজিংকে নিরাপত্তা নিয়ে চাপে ফেলেছে। এখন যদি মার্কিন সংস্থাগুলিও একই নিরাপত্তা সমস্যায় পড়ে, তাহলে পাকিস্তানের “খনিজ কূটনীতি” কতটা বাস্তবায়নযোগ্য, সেই প্রশ্ন আরও জোরালো হবে।
অন্যদিকে, ওয়াশিংটন গত কয়েক বছর ধরে চীনের নিয়ন্ত্রণাধীন critical-mineral supply chain-এর বিকল্প তৈরি করতে চাইছে। পাকিস্তানও এই সুযোগে নিজের বিপুল খনিজ সম্পদকে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। কিন্তু নিরাপত্তা, অবকাঠামোর ঘাটতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং খনিজ উত্তোলনের বাস্তব সক্ষমতা—সব মিলিয়ে প্রকল্পগুলির ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত। CSIS-ও মার্কিন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এই কাঠামোগত ঝুঁকিগুলির কথা উল্লেখ করেছে।
ফলে বালোচিস্তানে US Strategic Metals-এর কাজ সত্যিই যদি দীর্ঘ সময়ের জন্য থমকে যায়, তা হলে পাকিস্তানের জন্য এটি শুধু একটি বাণিজ্যিক ধাক্কা নয়—চিনের বিকল্প হিসেবে আমেরিকাকে খনিজ ক্ষেত্রে নিয়ে আসার ইসলামাবাদের বৃহত্তর কৌশলের জন্যও বড় ধাক্কা হতে পারে।