• ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩
  • মঙ্গলবার
  • ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
China Job Crisis

‘বিশ্বের কারখানা’ চিনে এবার শ্রমিকেরই কাজ নেই! অটোমেশন-এ বাড়ছে চাকরির সংকট

চিনে কারখানা ও উৎপাদন বাড়লেও কর্মসংস্থান কমছে। অটোমেশন, AI, রোবোটিক্স, রিয়েল এস্টেটের মন্দা এবং রেকর্ড সংখ্যক গ্র্যাজুয়েটের কারণে দেশটির শ্রমবাজারে তৈরি হয়েছে নতুন সংকট। মে মাসে তরুণ বেকারত্বের হার ছিল ১৫.৬ শতাংশ, জুলাইয়ে তা বেড়ে ১৭.৯ শতাংশ হয়েছে।

‘বিশ্বের কারখানা’ চিনে এবার শ্রমিকেরই কাজ নেই! অটোমেশন-এ বাড়ছে চাকরির সংকট

China Job Crisis

Published by: cloud_admin
  • Posted:September 8, 2026 3:01 pm
  • Update:September 8, 2026 3:01 pm
  • Facebook
  • Telegram
  • X
  • Whatsapp

একসময় গোটা বিশ্বের ‘কারখানা’ হিসেবে পরিচিত ছিল চিন। সস্তা শ্রম, বিপুল কর্মী এবং বিশাল উৎপাদন ক্ষমতার উপর ভর করে গত কয়েক দশকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে দেশটি। কিন্তু সেই মডেলেই এবার বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। কারখানা চলছে, উৎপাদন বাড়ছে, প্রযুক্তি এগোচ্ছে—কিন্তু প্রয়োজন হচ্ছে কম শ্রমিকের।

অটোমেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং রোবোটিক্সের দ্রুত প্রসারের পাশাপাশি উৎপাদন খাতে চাকরি অন্য দেশে সরে যাওয়া এবং আবাসন শিল্পের মন্দা চিনের শ্রমবাজারে চাপ বাড়াচ্ছে। এর সবচেয়ে বড় ধাক্কা পড়ছে তরুণদের উপর।

১২.৭ কোটি নয়, ১.২৭ কোটি গ্র্যাজুয়েটের সামনে চাকরির প্রশ্ন

২০২৬ সালে চিনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলি থেকে রেকর্ড ১.২৭ কোটি তরুণ-তরুণী কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করছেন। কিন্তু সেই তুলনায় চাকরির বাজারে পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি হচ্ছে না।

 মে মাসে ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সি তরুণদের বেকারত্বের হার ছিল ১৫.৬ শতাংশ। অর্থাৎ বিপুল সংখ্যক তরুণ চাকরি খুঁজলেও তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না।

আগস্টে প্রকাশিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে চিনের ১৬-২৪ বছর বয়সি শহুরে তরুণদের বেকারত্বের হার আরও বেড়ে ১৭.৯ শতাংশে পৌঁছেছিল।

কয়েক সপ্তাহের চাকরিতেই ছাঁটাই ১০৭ গ্র্যাজুয়েট

চিনের চাকরির বাজারের পরিস্থিতি বোঝাতে একটি ঘটনা বিশেষভাবে সামনে এসেছে। পূর্ব চিনের গাড়ির যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারী সংস্থা Changzhou Xingyu Automotive Lighting এ বছর ৪৪০ জন সদ্য স্নাতককে নিয়োগ করেছিল। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তাঁদের মধ্যে ১০৭ জনকে ছাঁটাই করা হয়।

ঘটনাটি চিনে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করে। সংস্থাটি পরে ‘ম্যানেজমেন্ট ব্যর্থতা’ এবং সহানুভূতির অভাবের কথা স্বীকার করে।

এই ঘটনাকে শুধুমাত্র একটি সংস্থার সমস্যা হিসেবে দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। বরং এটি চিনের শ্রমবাজারে তৈরি হওয়া বৃহত্তর সমস্যার প্রতীক—উৎপাদন বাড়লেও সেই উৎপাদনের জন্য আগের মতো বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রয়োজন হচ্ছে না।

কারখানায় রোবট, মানুষের কাজ কমছে

চিন দীর্ঘদিন ধরেই শিল্পক্ষেত্রে অটোমেশন বাড়ানোর উপর জোর দিচ্ছে। রোবোটিক্স, AI এবং উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে।

চিনে মানবসদৃশ রোবট বা humanoid robot নিয়েও বিপুল বিনিয়োগ হচ্ছে। তবে এই প্রযুক্তি এখনও সব ধরনের কারখানার কাজ মানুষের জায়গায় পুরোপুরি করতে সক্ষম হয়নি। প্রচলিত শিল্প রোবটই বর্তমানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর।

অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু ‘রোবট এসে মানুষের চাকরি নিয়ে নিচ্ছে’—এত সরল নয়। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তির ব্যবহার, সস্তা শ্রমের দেশগুলিতে উৎপাদন সরানো এবং চিনের অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তন—সব মিলিয়ে কর্মসংস্থানের চরিত্র বদলে যাচ্ছে।

নির্মাণ শিল্পেও বড় ধাক্কা

চিনের রিয়েল এস্টেট খাতের দীর্ঘমেয়াদি সংকটও শ্রমবাজারে বড় প্রভাব ফেলেছে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে নির্মাণ শিল্প থেকে ১.৪ কোটিরও বেশি শ্রমিক বেরিয়ে গিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে স্থায়ী চাকরির অভাবের কারণে গিগ ইকোনমির উপর নির্ভরতা বাড়ছে। ২০২৬ সালে চিনের গিগ কর্মীর সংখ্যা প্রায় ৩২ কোটি হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভারতের জন্য কি সুযোগ?

চিনের উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান কমার অর্থ এই নয় যে ভারত সহজেই ‘বিশ্বের কারখানা’ হয়ে যাবে। বরং বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি অনেক বেশি জটিল।

Grant Thornton Bharat-এর অর্থনৈতিক পরামর্শদাতা রিশি শাহ জানিয়েছেন, চিনের ম্যানুফ্যাকচারিং কর্মসংস্থান ২০১৩ সালের প্রায় ১৫.২ কোটি থেকে কমে ২০২৫ সালে প্রায় ১৩.৪ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু একই সময়ে বিশ্বে চিনের manufactured exports-এর অংশ বেড়েছে। অর্থাৎ উৎপাদন ক্ষমতা কমেনি; বরং কম শ্রমিক দিয়ে বেশি উৎপাদন সম্ভব হয়েছে।

ভারত ইতিমধ্যেই Production-Linked Incentive বা PLI প্রকল্পের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে চিনের জায়গা নিতে হলে শুধু অ্যাসেম্বলি নয়, কম্পোনেন্ট, গবেষণা, উন্নত উৎপাদন এবং গভীর সাপ্লাই চেন তৈরি করতে হবে।

চিনের অভিজ্ঞতা তাই ভারতের জন্য একই সঙ্গে সুযোগ এবং সতর্কবার্তা। প্রযুক্তি যত এগোবে, শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না—সেই উৎপাদন কত মানুষের জন্য টেকসই কর্মসংস্থান তৈরি করছে, সেটিও বড় প্রশ্ন হয়ে উঠছে।

আরও খবর