• ২ কার্তিক ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ১৯ অক্টোবর ২০২৬
Ajit Doval Mizoram Sikkim

মিজোরাম থেকে সিকিম—অজিত দোভালের গোয়েন্দা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়

মিজোরামের সশস্ত্র বিদ্রোহ দমনে অজিত দোভালের গোয়েন্দা ভূমিকা তাঁর কর্মজীবনের অন্যতম আলোচিত অধ্যায়। লালডেঙ্গার সাত গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডারের মধ্যে ছয়জনকে ভারতীয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগে আনার কৃতিত্ব তাঁর নামে প্রচলিত। অন্যদিকে, ১৯৭৫ সালে সিকিমের ভারতভুক্তি ছিল বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া, যেখানে R&AW এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

মিজোরাম থেকে সিকিম—অজিত দোভালের গোয়েন্দা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়

Ajit Doval Mizoram Sikkim

Published by: cloud_admin
  • Posted:September 24, 2026 12:23 pm
  • Update:September 24, 2026 12:23 pm
  • Facebook
  • Telegram
  • X
  • Whatsapp

ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের দীর্ঘ গোয়েন্দা জীবনের শুরুতেই উত্তর-পূর্ব ভারত তাঁর কর্মজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল। মিজোরামে সশস্ত্র বিদ্রোহের মোকাবিলায় তাঁর ভূমিকা নিয়ে বহু বছর ধরে নানা কাহিনি প্রচলিত। পরবর্তী সময়ে সিকিমের ভারতের সঙ্গে একীভূত হওয়ার ঘটনাতেও তাঁর ভূমিকার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

তবে ইতিহাসের এই অধ্যায়কে শুধুমাত্র একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তার অভিযান হিসেবে দেখা ঠিক নয়। মিজোরাম ও সিকিম—দুই ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সেনা, গোয়েন্দা সংস্থা এবং স্থানীয় রাজনৈতিক শক্তির সম্মিলিত ভূমিকা ছিল।

লালডেঙ্গার বিদ্রোহ এবং মিজোরামে দোভালের প্রবেশ

১৯৫৯ সালে মিজোরামের বাঁশবনে ব্যাপক ফুল ফোটার পর ‘মাউতাম’ নামে পরিচিত খাদ্যসংকট তৈরি হয়। এই পরিস্থিতির মধ্যে লালডেঙ্গার নেতৃত্বে মিজো ন্যাশনাল ফ্যামিন ফ্রন্ট গড়ে ওঠে। পরে সংগঠনটির নাম হয় মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্ট বা MNF।

১৯৬৬ সালে MNF সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করে। সংগঠনটি মিজোরামকে ভারত থেকে আলাদা করার দাবি তোলে। বিদ্রোহ দমন করতে ভারতীয় সেনা মোতায়েন করা হয়। সেই সময় ভারতীয় বিমানবাহিনীও মিজোরামে বিদ্রোহীদের অবস্থানের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালায়। এটি ভারতের স্বাধীনতার পর অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমনে বিমানশক্তি ব্যবহারের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হয়ে ওঠে।

অজিত দোভাল ১৯৬৮ সালে কেরালা ক্যাডারের IPS কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৭২ সালে তিনি Intelligence Bureau বা IB-তে যোগ দেন। এরপর মিজোরাম তাঁর প্রথম বড় গোয়েন্দা দায়িত্বগুলির অন্যতম হয়ে ওঠে।

দোভাল ১৯৭২ থেকে ১৯৭৭ সালের মধ্যে মিজোরামে IB-এর Subsidiary Intelligence Bureau-র দায়িত্বে ছিলেন বলে বিভিন্ন জীবনীমূলক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। তিনি দীর্ঘ সময় গোপন পরিচয়ে কাজ করেছিলেন বলেও একাধিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

তাঁর সবচেয়ে আলোচিত সাফল্য ছিল MNF-এর নেতৃত্বের ভিতরে বিভাজন তৈরি করা। প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, লালডেঙ্গার সাতজন গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডারের মধ্যে ছয়জনকে তিনি ভারত সরকারের সঙ্গে যোগাযোগে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন। এর ফলে MNF-এর সাংগঠনিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।

এই কৌশলের উদ্দেশ্য ছিল শুধু সামরিকভাবে বিদ্রোহ দমন করা নয়। বরং বিদ্রোহীদের একটি অংশকে আলোচনার পথে আনা এবং রাজনৈতিক সমাধানের পরিবেশ তৈরি করা। দোভালের এই ভূমিকার কথা তাঁর কর্মজীবনের বিভিন্ন বিবরণে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

১৯৮৬ সালের মিজো শান্তিচুক্তির পথ তৈরি

দোভালের মিজোরাম-পর্ব শেষ হয় ১৯৭০-এর দশকে। কিন্তু সেই সময় তৈরি হওয়া যোগাযোগ ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার পরবর্তী প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়।

লালডেঙ্গা শেষ পর্যন্ত ভারত সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। ১৯৮৬ সালে রাজীব গান্ধীর সরকারের সময়ে মিজো শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। লালডেঙ্গা পরবর্তীতে মিজোরামের মুখ্যমন্ত্রী হন।

তবে ১৯৮৬ সালের চুক্তিকে শুধুমাত্র দোভালের ব্যক্তিগত সাফল্য হিসেবে দেখলে ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। বহু বছরের রাজনৈতিক আলোচনা, বিদ্রোহ, সামরিক অভিযান এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আলোচনার ফলেই শেষ পর্যন্ত চুক্তি সম্ভব হয়।

দোভালের মিজোরাম অভিযানের একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল অস্ত্রের বদলে গোয়েন্দা তথ্য এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগ ব্যবহার করে বিদ্রোহী নেতৃত্বের ভিতরে প্রভাব তৈরি করা। তাঁর এই ভূমিকার কারণেই পরবর্তী সময়ে তাঁকে ভারতের অন্যতম পরিচিত গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের একজন হিসেবে তুলে ধরা হয়।

সিকিমের ভারতভুক্তি: দোভালের ভূমিকা কতটা?

মিজোরামের পর দোভালের নাম সিকিমের সঙ্গেও জড়িয়ে যায়। কিন্তু এখানেই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা প্রয়োজন।

১৯৪৭-এর পর সিকিম ভারতের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক বজায় রেখেছিল। ১৯৫০ সালের চুক্তির মাধ্যমে সিকিমের অভ্যন্তরীণ প্রশাসন চোগিয়ালের হাতে থাকলেও প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতিতে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

১৯৭০-এর দশকের শুরুতে সিকিমে রাজতন্ত্রবিরোধী আন্দোলন জোরদার হয়। ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পক্ষে থাকা রাজনৈতিক শক্তিগুলিও শক্তিশালী হতে থাকে।

এই সময় R&AW সিকিমে সক্রিয় হয়ে ওঠে। প্রাক্তন R&AW কর্মকর্তা জি. বি. এস. সিধুর স্মৃতিকথার ভিত্তিতে প্রকাশিত বিবরণে বলা হয়েছে, ১৯৭৩ সালে তিনি একটি R&AW দলের নেতৃত্ব দিয়ে গ্যাংটকে যান। তাঁর দায়িত্বের মধ্যে ছিল সিকিমের রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে যোগাযোগ এবং ভারতপন্থী ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তিগুলিকে সংগঠিত করতে সহায়তা করা।

১৯৭৪ সালের নির্বাচনে কাজী লেন্দুপ দর্জির নেতৃত্বাধীন সিকিম কংগ্রেস জয়ী হয়। এরপর রাজতন্ত্রের ক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া হয় এবং সিকিমের রাজনৈতিক কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আসে।

১৯৭৫ সালে সিকিমে গণভোট হয়। সরকারি হিসাবে ৫৯,৬৩৭টি ভোট ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়া এবং রাজতন্ত্র বিলোপের পক্ষে পড়ে। বিপক্ষে ভোট পড়ে ১,৪৯৬টি। এরপর ভারতীয় সংসদ সংবিধানের ৩৬তম সংশোধনী পাস করে। ১৬ মে ১৯৭৫ সিকিম ভারতের ২২তম রাজ্য হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হয়।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় R&AW এবং ভারতীয় প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তবে সিকিমের একীভূতকরণের মূল গোয়েন্দা অপারেটর হিসেবে অজিত দোভালকে এককভাবে চিহ্নিত করার পক্ষে শক্তিশালী প্রামাণ্য তথ্য নেই। বরং উপলব্ধ ঐতিহাসিক বিবরণে জি. বি. এস. সিধুর ভূমিকা স্পষ্টভাবে উঠে আসে।

অজিত দোভালের মিজোরাম অধ্যায় অবশ্য তাঁর গোয়েন্দা জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। বিদ্রোহী নেতৃত্বের ভিতরে যোগাযোগ তৈরি করে ছয়জন গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডারকে মূলধারার দিকে আনার কাহিনি তাঁর গোয়েন্দা কর্মজীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলির একটি।

তাই অজিত দোভালকে নিয়ে প্রচলিত ‘ভারতের জেমস বন্ড’ পরিচয়ের বাইরে দেখলেও তাঁর প্রাথমিক গোয়েন্দা জীবনের মিজোরাম অভিযান ভারতীয় নিরাপত্তা ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। আর সিকিমের ভারতভুক্তি ছিল তার থেকেও বৃহত্তর একটি রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া, যেখানে R&AW, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং ভারত সরকারের একাধিক স্তরের ভূমিকা ছিল।

আরও খবর